তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে হতাশার কিছু নেই : পানিসম্পদ উপদেষ্টা
রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:০০
ছবি : বাংলাদেশের খবর
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বলেছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার ও চীন সরকার উভয়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাড়াহুড়া নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাই শেষে কাজ শুরু করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ত্রুটি না থাকে এবং তিস্তা পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা নদীর ১০ নম্বর টুনুর ঘাট ও তালুক শাহবাজ এলাকার নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়ানসি ইয়াও ওয়েন, রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আঞ্চলিক কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা।
উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমরা যে প্রকল্পটি চীনে পাঠিয়েছি, সেটি নির্দিষ্ট সময়সূচি উল্লেখ করেই পাঠানো হয়েছে। চীন সরকার প্রকল্পটি পাওয়ার পর তাদের বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই শুরু করেছেন। এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়।’
তিনি স্পষ্ট করে জানান, জানুয়ারির মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরু নাও হতে পারে। তবে এ নিয়ে হতাশা ছড়ানো একেবারেই অযৌক্তিক। তিনি বলেন, ‘হতাশ হয়ে কী লাভ? তাড়াহুড়া করে নির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে কাজ শুরু করলে ভবিষ্যতে বড় জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা সংশোধন করা কঠিন হয়ে যাবে। আমরা চাই কাজটি যেন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা একটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক প্রকল্প। এতে একসঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ এবং সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতেই সময় লাগছে। এ কারণেই চীনের বিশেষজ্ঞরা বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটি যাচাই করছেন।
তিনি জানান, পূর্ববর্তী সময়ে প্রণীত প্রকল্পে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি ছিল। এবার সেই জায়গাগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে গণশুনানি, জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণের পরই প্রকল্পটি চীনে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব'। চীন আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র। ‘আমাদের একটি নদীর উৎস চীনে। স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনাতেও তারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। এজন্য চীনের প্রতি আমাদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। তাই ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার যেন আর প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা করতে না হয়, সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে যেতে চায়।
উপদেষ্টা বলেন, ‘পানির ন্যায্য হিসাব একটি দীর্ঘমেয়াদি ও চলমান প্রক্রিয়া। এটি দেড় বা দুই বছরের বিষয় নয়; বরং ৫৪ বছরের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। যেহেতু বিষয়গুলো বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত, তাই নির্বাচিত সরকার এসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেই ভালো হবে। তবে তাদের কাজ সহজ করতে আমরা গঙ্গা ও তিস্তা—উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রেখে যাচ্ছি।’
পরিদর্শনকালে উপদেষ্টা ও চীনা রাষ্ট্রদূত তিস্তা-লালমনিরহাট সড়ক সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার নকশা পর্যবেক্ষণ করেন। পরে নৌকাযোগে তিস্তা নদীর দুই পাড়ের ভাঙন এলাকা ঘুরে দেখেন এবং সরেজমিন পরিস্থিতি রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করা হয়।
শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি কারণ এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কাজ থেমে নেই; বরং আরও দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাই আবারও বলছি—তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
এআরএস

