Logo

সারাদেশ

বাগেরহাটে ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী-সন্তানকে পাশাপাশি দাফন

হত্যা-আত্মহত্যা নিয়ে দুই পরিবারের বিপরীতমুখি বক্তব্য

Icon

বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৩

বাগেরহাটে ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী-সন্তানকে পাশাপাশি দাফন

বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দামের স্ত্রী সন্তানকে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টার দিকে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে স্বর্ণালীর বাবার বাড়ির কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। এর আগে সাবেকডাঙ্গা স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১ টা ২০ মিনিটে তাদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে গৃহবধূর স্বামীর বাড়ি থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ ও মেঝে থেকে ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার হয়।

এদিকে মৃত্যুর দুই দিন পার হলেও সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পুরো জেলা জুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। কেউ কেউ দাবি করছে, সাদ্দাম জেলে থাকার কারণে অভাবের তাড়নায় তার স্ত্রী ছেলেকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন। আবার কেউ দাবি করেছেন, সাদ্দাম পলাতক থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করায় তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য সাদ্দামকে প্যারোলে কেন মুক্তি দেওয়া হল না এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই।

তবে রবিবার সকালে সাদ্দামের বাড়িতে স্থানীয় বাসিন্দা ও তার পরিবারের লোকজনের ভীড় ছিল। সাদ্দামের বাড়িতে একতলা ভবন। সাদ্দামরা তিন ভাই ও তিন বোন। বাবা একরাম হাওলাদার মারা গেছেন ৫ বছর আগে। এক তলা এই ভবনে সাদ্দামের মা, এক বোন ও সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তান থাকতেন। সাদ্দামের এক ভাই সরকারি চাকুরী করেন, আরেক ভাই প্রকৌশলী- তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন। 

এই ভবনের সামনে দাড়িয়ে কথা হয় সাদ্দামের মা ও ছোট ভাই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের সাথে।

সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম বলেন, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভাতিজীর বিয়েতে অংশগ্রহণের জন্য বাগেরহাট শহরের বগা ক্লিনিক এলাকায় আসি। তখন তার পুত্রবধু, নাতি, এক মেয়ে ও মেয়ের ছেলে বাড়িতে ছিল। পুত্রবধু কানিজের সাথে কথা ছিল, দুপুরের দিকে তিনিও ওই বিয়ে বাড়িতে যাবেন। কিন্তু ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে সাদ্দামের মাকে পাশের বাড়ি থেকে মুঠোফোনে জানানো হয়, তার পুত্রবধু গলায় রশী দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পরে তারা ছুটে আসেন।

সাদ্দামের মা আরও বলেন, ‘আমার খুব শান্তির সংসার, বউ মা ও নাতনিকে নিয়ে আমি থাকতাম বাড়িতে। বউমার সাথে আমার খুবই ভাল সম্পর্ক। আমার সংসারে কোন অভাব ছিল না। কিন্তু কেন যে ও এমন করল জানি না।’

সাদ্দামের ভাই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সংসারে কোন অভাব-অনটন ছিল না। আর আমার ভাই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, এমন কোন তথ্য আমাদের জানা নেই। যারা এসব প্রচার করছেন, তারা হয়ত কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভাবি (কানিজ) আমাকে কয়েকবার বলেছেন যে দুই মাস হয়ে যায়, তার বাবা তাকে এবং তার ছেলেকে দেখতে আসেন না। এছাড়া অনেকে ভাবিকে বলেছেন, যে তার স্বামী (সাদ্দাম) আর কোন দিন জেল থেকে বের হতে পারবেন না। এসব নিয়েও, ভাবির মধ্যে হতাশা ছিল।’

এদিকে শুক্রবার সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তান মারা যাওয়ার পরে তার শ্বশুর রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছিলেন তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এ নিয়ে তার কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু গতকাল শনিবার সাদ্দামের শ্বশুর রুহুল আমিন হাওলাদার বাদী হয়ে বাগেরহাট মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে হয়ত ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, আর আমার নাতী কিভাবে মারা গেল, এটা জানার জন্য হত্যা মামলা করা হয়েছে। প্রশাসন যা ভাল মনে করেছে তাই করেছে। তদন্তে সঠিক বিষয় বেরিয়ে আসবে।

এদিকে নিহত কানিজের ভাই শাহনেওয়াজ আমিন শুভ বলেন, আমার বোন আত্মহত্যা করার মতো মানুষ না। সে আত্মহত্যা করতে পারে না। আমরা প্রথমে যদিও বলেছিলাম, সে আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু নানা বিষয় চিন্তা করে আমরা মনে করছি সে আত্মহত্যা করেনি। এছাড়া আত্মহত্যার পরে সাদ্দামের পরিবারের যে ব্যবহার তাতে মনে হয়েছে, কোন সমস্যা আছে।

সাদ্দামের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে শুভ বলেন, কয়েকজনের কাছে শুনেছি, সাদ্দামের দ্বিতীয় বিয়ের পরিবারের লোকজন সাদ্দামের বাড়িতে এসেছিল। এরপর থেকে আমার বোনের মন খারাপ ছিল। 

এ বিষয়ে বোনের সাথে আপনার কথা হয়েছে কিনা এবং আপনাকে কে বলেছে এমন প্রশ্ন করলে, ‘শুভ বলেন আমি শুনেছি। আর বোনও এ বিষয়ে আমার বোন আমাকে কিছু জানায়নি।’

এদিকে গতকাল শনিবার দুপুরে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মা ও ছেলের মরদেহ সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সুবর্ণার বাবার বাড়িতে আনা হয়। সেখানে গোছল শেষে বিকেল সোয়া চারটার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় তাদের মরদেহ। সেখানে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন সাদ্দাম।

কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, মানবিক দিক বিবেচনায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে জুয়েলের পরিবারের ছয় সদস্যকে কারা ফটকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।

কানিজ ও জুয়েল নিজেদের পছন্দে কয়েক বছর আগে বিয়ে করেন। সন্তানের জন্মের আগে থেকেই জুয়েল কারাগারে আছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন জুয়েল।

সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা তার মামা হেমায়েত হোসেন বলেন, আমি আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু যশোর জেলে তাই আমাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। পরে বাগেরহাটের জেল সুপারের সাথে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, আমাদের কোন সুযোগ নেই, আপনারা যশোরে মরদেহ নিয়ে দেখা করিয়ে আসেন। পরে আমরা যশোরে দেখা করিয়েছে। সেখানেও মাত্র ৪-৫ মিনিট সময় দিয়েছে মাত্র।

তিনি আরও বলেন, যদি জেলা প্রশাসন ও কারাগার থেকে যদি আমাদের বলা হত যশোরে আবেদন করেন তাহলে আমরা যশোরে আবেদন করতাম। কিন্তু আমাদের কেউ জানায়নি, যে যশোরে আবেদন করলে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে।

প্যারোলের বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘প্যারোলের একটি আবেদন নিয়ে আসছিল। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। যেহেতু সে আছে যশোরের কারাগারে, আবেদন করতে হবে সেখানকার (যশোরের) জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে। তবে প্যারোলের ক্ষেত্রে মুক্তি পেলে শুধু মাত্র ওই জেলার মধ্যে তার প্যারোলের হুকুমটা কার্যকর হবে। এখানকার প্রশাসন তাদের বিষয়ে যশোর জেলা কারাগারেও বলে দিয়েছিল।

কারাকর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছিল, যেন সুন্দর ভাবে সঠিকভাবে তাদের মৃত স্বজনের লাশ দেখতে পারে। আমরা তাদের সেখানে যাওয়া এবং দেখার বিষয়ে সহযোগিতা করেছি।’

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী বলেন, ‘মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি।’

যেসব ধোয়াশা আছে সেগুলো তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

শেখ আবু তালেব/এসএসকে/

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ছাত্রলীগ আত্মহত্যা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর