Logo

সারাদেশ

মান্দার অদম্য ইব্রাহিমের এক জীবনযুদ্ধের গল্প

Icon

এম এ রাজ্জাক, নওগাঁ

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ২০:৩৩

মান্দার অদম্য ইব্রাহিমের এক জীবনযুদ্ধের গল্প

এম এ রাজ্জাক, নওগাঁ 

দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন দুই হাত, অবশ হয়ে গেছে দুই পা-ও। গত দুই দশক ধরে হুইলচেয়ারই তার নিত্যসঙ্গী। সাধারণ মানুষের চোখে যা ‘বিশাল প্রতিবন্ধকতা’, নওগাঁর মান্দা উপজেলার চককেশব (বালুবাজার) গ্রামের ইব্রাহিম মল্লিকের কাছে তা কেবলই একটি শারীরিক সীমাবদ্ধতা। হাত নেই তো কী হয়েছে? দাঁত আর ঠোঁট দিয়ে তুলি কামড়ে ধরে ক্যানভাসে তিনি ফুটিয়ে তুলছেন একের পর এক অনবদ্য ছবি। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে নিয়তি; দেশ ছাড়িয়ে তার আঁকা ছবি এখন সমাদৃত হচ্ছে বিদেশের মাটিতেও।

ইব্রাহিমের জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ২০০৫ সালে। তখন তিনি পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কাজ করতে গিয়ে এক ভয়াবহ বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় চিরতরে হারিয়ে ফেলেন দুই হাত, অকেজো হয়ে যায় দুই পা। দীর্ঘ ৮ বছর সাভারের সিআরপিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। সেখানেই এক বিদেশি প্রতিবন্ধী শিল্পীর জীবনগল্প শুনে অনুপ্রাণিত হন ইব্রাহিম। শুরু হয় ‘মাউথ পেইন্টিং’ বা মুখ দিয়ে ছবি আঁকার এক কঠিন লড়াই। শুরুতে অসম্ভব মনে হলেও অসীম ধৈর্য আর সাধনায় এ পর্যন্ত তিনি এঁকেছেন ৩ হাজারেরও বেশি ছবি।

ইব্রাহিমের এই সংগ্রামকে অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছে স্থানীয় প্রশাসন। মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, “ইব্রাহিম মল্লিক আমাদের সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। শারীরিক সীমাবদ্ধতা যে মেধার কাছে হার মানে, তিনি তার জীবন্ত প্রমাণ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে তাকে একটি দুর্যোগ সহনীয় ঘর করে দেওয়া হয়েছে। তার চিকিৎসা ও যেকোনো প্রয়োজনে আমরা সবসময় পাশে থাকব।”

একই অভিমত ব্যক্ত করেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আরিফুল ইসলাম। তিনি জানান, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ইব্রাহিমকে একটি মানসম্মত ঘর করে দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি নিরাপদে তার শিল্পকর্ম চালিয়ে যেতে পারেন। এমন প্রতিভাকে সহযোগিতা করতে পেরে আমরা গর্বিত।”

ইব্রাহিমের সাফল্যে আনন্দিত এলাকার মানুষও। কামারকুরি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজহার আলী বলেন, “ইব্রাহিম এই এলাকার সন্তান হিসেবে আমাদের গর্ব। যে অসীম ধৈর্য ও মেধা দিয়ে তিনি মুখ দিয়ে ছবি আঁকেন, তা সমসাময়িক প্রজন্মের জন্য একটি বড় শিক্ষা।” স্থানীয় বাসিন্দা রহিদুল ইসলাম ও মোবারক হোসেন জানান, ইব্রাহিম শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে বাঁচার প্রতীক।

সফলতার গল্পের আড়ালে বর্তমানে এক চরম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এই শিল্পী। দীর্ঘদিন হুইলচেয়ারে বসে ছবি আঁকতে গিয়ে ইব্রাহিমের পিঠের দুই পাশে গভীর ক্ষতের (বেড সোর) সৃষ্টি হয়েছে। গত তিন মাস ধরে তিনি পুরোপুরি শয্যাশায়ী। কিন্তু শরীর হার মানলেও মন মানেনি। এক কাতে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও এখনো মুখ দিয়ে তুলি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ইব্রাহিম মল্লিক জানান, জীবনের বাকিটা সময় ছবি এঁকেই সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকতে চান তিনি। তবে বর্তমানে পিঠের ইনফেকশনের উন্নত চিকিৎসার জন্য তার বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। নিজের সৃজনশীলতাকে বিশ্ব দরবারে আরও উঁচুতে তুলে ধরতে তিনি বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের সহযোগিতা কামনা করছেন।

এক অদম্য যোদ্ধার এই লড়াই যেন থমকে না যায়- এখন এটাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।

বিকেবি/ মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন