শিবালয়ে জ্বালানি সংকটে যানবাহন চালক ও কৃষকদের ভোগান্তি চরমে
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৩২
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এরই ধারাবাহিতায় মানিকগঞ্জের শিবালয়েও বেশ কিছুদিন যাবৎ জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। চাহিদা অনুযায়ী তেলের সরবরাহ কম থাকায় পাম্প মালিক ও তেলে ডিলার বিপাকে পড়েছেন। এর ফলে চরম ভোগান্তিতে পরেছেন স্পিডবোট, লঞ্চ, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা।এছাড়া এ অঞ্চলে বোরোর চাষের ভরা মওসুম চলছে। পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ ও জমিতে সেচ দেয়া নিয়ে নানা সমস্যায় ভুগছেন স্থানীয় কৃষকরা। তেলের জন্য পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কাঙ্খিত তেল, আর এমনটাই অভিযোগ করছেন তেলের ক্রেতারা। কোন পাম্পে তেলের গাড়ি ঢুকতে দেখলেই হুমরি খেয়ে পড়ছে গ্রাহকরা। তেল সংকটের এমন পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে তেলতো নয়, যেন সোনার হরিন।
জানা গেছে, শিবালয় উপজেলায় পেট্রোল ও ডিজেলের
মোট ৪টি ফিলিং স্টেশন এবং ৭টি ডিলার রয়েছে।এসব পাম্প ও ডিলারদের বিগত দিনের চেয়ে এবার
দ্বিগুণ পরিমানে তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। যে কারণে ডিলার ও পাম্পগুলোতে চাহিদার অর্ধেক
তেল পাচ্ছে। ফলে, গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তারা
জানান।
উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনগুলো বিগত
কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে ও ডিলারদের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম
থাকায় প্রায় অধিকাংশ ডিলার ও ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে
মধ্যেই অনেক ডিলার ও পাম্পে তেল না থাকায় কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। দু/একটিতে
সীমিত পরিমাণে শুধু ডিজেল ও পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে। তাও আবার দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষায় থেকে
তেল নিতে হচ্ছে। মঙ্গলবার রাতে আরিচা ঘাটের তেলের পাম্পে একটি গাড়ি আসলে গাড়ি থেকে
তেল নামানোর আগেই মটর সাইকেল চালকদেরকে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে
দেখা গেছে।
মোটরসাইকেল চালক মো. জসিম বলেন, ‘নিজের টাকা দিয়ে তেল কিনতে এসেও ঘণ্টার
পর ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবু তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কাজকর্মের
চরম সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।’ ট্রাক চালক আব্দুল মান্না বলেন, ‘ডিজেল না পেলে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। ডিজেল
সংকটের কারণে মাঝে মধ্যেই গাড়ি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, ‘ডিজেল নিতে এসে পেলাম না। এখন বোরো ধানের
চারা কীভাবে লাগাব? তেল না পেলে পাওয়ার টিলার চালানো এবং সেচ দেওয়া সম্ভব নয়।’
আরেক কৃষক নবীন বলেন, আমার পাওয়ার টিলারে
প্রতিদিন ৩০লিটার ডিজেল লাগে। দোকানে গেলে দেয় ৫লিটার। অনেক সময় তেল আনতে গিয়ে ঘন্টার
পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়া যায়নাল ‘চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।
এতে কৃষকেরা দুশ্চিন্তায় আছেন।’
স্থানীয় ব্যাবসায়ী রুবেল মিয়া বলেন, আমরা
আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে চলাচলরত স্পিডবোটগুলোতে পেট্রোল সরবরাহ করে থাকি। কিন্তু বেশ
কিছুদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী আমরা তেল পাচ্ছিনা। আমাদের প্রতিদিন পেট্রোলের চাহিদা রয়েছে
১২হাজার লিটার কিন্ত পাচ্ছি ৭/৮হাজার লিটার। যে কারণে বোট চালকদের চাহিদা অনুপাতে তেল
সরবরাহ করতে পারছি ন। এতে উক্ত নৌরুটে স্পিডবোট সার্ভিস ব্যহত হচ্ছে।
সানোরমা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো.
দাউদ হায়দার বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন আমাদের গ্রাহকের জ্বালানির যে চাহিদা রয়েছে সে
অনুপাতে আমরা অর্ধেক পাচ্ছি। গতকাল মঙ্গলবার আমাদের ১৮হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা ছিল
পেয়েছি ৯হাজার লিটার এবং অকটেনের চাহিদা ছিল ৯হাজার লিটার পেয়েছি সাড়ে ৪হাজার লিটার।
আগে দেখা গেছে একজন মটরসাইকেল চালক ২শ’ টাকার অকটেন নিতো আর এখন ৫শ’ টাকার আবার পিছন
দিয়ে ঘুরে এসেই আবার ৫শ’টাকার অকটেন নিয়ে যাচ্ছে। এর আগে স্পিডবোটের জন্য আমরা ১৫০/২০০লিটার অকটেন দিতাম
কিন্তু তারা একবারে এসে ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ লিটার করে অকটেন নিচ্ছে। যে কারণে পাম্পে জ্বালানী
আসার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
শিবালয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া তরফদার
বলেন, শিবালয়ে আবাদি জমির পরিমান রয়েছে ১১ হাজার ৩৪৭ হেক্টর। ডিজেল চালিত অগভীর ২৪৬৫টি,
বিদ্যুৎ চালিত ৪৯৩টি এবং ডিজেল চালিত গভীর ১৯টি ও বিদ্যুৎ চালিত ১টি সেচ পাম্প রয়েছে।
কিন্তু বিগত কয়েকদিন ধরে এ এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। যে কারণে এ রকম বৃষ্টিপাত অব্যহত থাকলে
সেচের কোন সমস্যা হবে না বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে শিবালয় উপজেলা সহকারি কমিশনার
(ভুমি) জান্নাতুল নাইম বলেন, জনগণের বেশী চাহিদার কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
এমনও দেখা গেছে, একজন মটরসাইকেল চালক আগে ২ লিটার অকটেন নিতো এখন সে ৫ থেকে ১০লিটার
করে অকটেন নিচ্ছে। যে কারণে চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমাদের সকলকেই সচেতন হওয়া
দরকার। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না নেওয়ায় শ্রেয়। এছাড়া ডোপ, বালতি বা বোতলে তেল
না দেয়া, কৃষক ছাড়া এবং যারা খোলা বাজারে বিক্রি করে তাদেরকে জ্বালানি না দেয়ার জন্য
পাম্প মালিকদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কেউ অসাধু উপায়ে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি
করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের
খবর/এম.আর

