৫ বছরে ২৫০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করল ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৩৭
প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় ২৫০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে এক অজ্ঞাত যুবকের দাফনের মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের ২৫০তম বেওয়ারিশ লাশ দাফন সম্পন্ন করে।
জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে কোনো পরিচয়হীন লাশ এলেই খবর দেওয়া হয় ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ মোঃ আজহার উদ্দিনকে। এরপর সংগঠনের উদ্যোগে ওই মরদেহ গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন।
সর্বশেষ দাফন হওয়া ওই যুবক (আনুমানিক বয়স ৩০) গত রোববার (৫ এপ্রিল) ভোরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায় অজ্ঞাত একটি যানবাহনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ সময়েও স্বজনদের সন্ধান না মেলায় অবশেষে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর উদ্যোগে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পূর্ব মেড্ডা তিতাস নদীর পাড়ে অবস্থিত বেওয়ারিশ লাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন জানান, মূলত করোনাকালে মৃত ব্যক্তিদের দাফনে স্বজনদের সংকট নিরসনে ২০২০ সালে প্রথম কাজ শুরু করি। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ১০-১২ সদস্য নিয়ে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করি। তখন অনেক পরিবারই ভয়ে বা অসহায়ত্বে প্রিয়জনের দাফনে এগিয়ে আসতে পারত না। সেই সময় থেকেই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তারা এই কাজ শুরু করি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন জানান, করোনাকালীন সময়ে স্বজনদের দাফন কার্যক্রমে দেখা দেওয়া সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই তিনি ২০২০ সালে প্রথম এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সে সময় অনেক পরিবার ভীতি ও অসহায়ত্বের কারণে প্রিয়জনের দাফনে এগিয়ে আসতে পারত না। পরবর্তীতে, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ১০-১২ জন সদস্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ নামে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও অজ্ঞাত রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়। হাসপাতাল বা পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ পেলেই ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ দাফনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রতিটি মরদেহ ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পুলিশ সেটি ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর কাছে হস্তান্তর করে। এরপর পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে দাফন কার্যক্রম শুরু করা হয়। দাফনের আগে কাফনের কাপড়, বাঁশ, চাটাইসহ প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী সংগ্রহ করা হয় এবং ইসলামী বিধান অনুযায়ী জানাজা সম্পন্ন করে মরদেহ দাফন করা হয়। এসব কার্যক্রম সম্পন্নে আর্থিক খরচটা সংগঠনপ্রধানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থায়নে বহন করা হয়। পাশাপাশি সংগঠনটির উদ্যোগে বিনামূল্যে রক্তদান, অক্সিজেন সেবা এবং অসহায় মানুষের বিভিন্ন সহায়তায় করে হয়ে থাকে।
এদিকে বর্ষা মৌসুমে ঝড়বৃষ্টির সময় অজ্ঞাত মরদেহ দাফন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় সংগঠনের সদস্যদের। কবরস্থানটি নিচু হওয়ায় সেখানে পানি জমে কবরগুলো ডুবে যায়। জানা গেছে, কবরস্থানটি মাটি ভরাটসহ সংস্কারের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে একাধিকবার জেলা প্রশাসক ও পৌরসভা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়েছে। এখনো তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম রকীব উর রাজা বলেন, (বৃহস্পতিবার) অজ্ঞাত মরদেহ দাফনকাজে আমার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও জরুরি সভায় ব্যস্ত থাকায় অংশ নিতে পারিনি। তিনি বলেন, চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করেছি, তবে নিঃস্বার্থভাবে অজ্ঞাত লাশ দাফনের এমন মানবিক উদ্যোগ আগে দেখিনি। এ ধরনের মহৎ কাজ সত্যিই বিরল। পরিচয়হীন লাশের দায়িত্ব নিতে অনেকেই এগিয়ে আসেন না, কিন্তু ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে সেই দায়িত্ব পালন করছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং সওয়াবের কাজ।” তিনি আশ্বাস দেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ মানবিক উদ্যোগে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
ট্রেন দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া কিংবা পচা-অর্ধগলিত লাশ, এ ধরনের বেশিরভাগ মরদেহই বেওয়ারিশ হিসেবে শনাক্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় মিললেও স্বজনরা না এলে সেসব লাশও দাফনের দায়িত্ব নেয় ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। মানবিকতার এই অনন্য দৃষ্টান্তে জেলায় সংগঠনটি ইতোমধ্যেই “বেওয়ারিশ লাশের শেষ ঠিকানা” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
বিকে/মান্নান

