Logo

সারাদেশ

পাহাড়ে বৈসাবির মহোৎসব, ফুল ভাসিয়ে সম্প্রীতির বার্তা

Icon

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২৫

পাহাড়ে বৈসাবির মহোৎসব,  ফুল ভাসিয়ে সম্প্রীতির বার্তা

পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন উৎসবের এক জীবন্ত ক্যানভাস। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন শুরু হয়েছে কাপ্তাই হ্রদ-এর পবিত্র জলে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে।

ভোরের আলো ফোটার আগেই হ্রদের তীরে শুরু হয় মানুষের ঢল। পাহাড়ি নারীরা হাতে তাজা ফুল, শিশুরা কৌতূহলভরা চোখে, আর প্রবীণরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, সবাই একসাথে প্রার্থনায় অংশ নেন। পুরাতন বছরের দুঃখ, বেদনা ও গ্লানি দূর করে নতুন বছরের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের প্রত্যাশায় পানিতে ভাসানো হয় রঙিন ফুল। দৃশ্যটি যেন প্রকৃতি, মানুষ আর বিশ্বাসের এক অপূর্ব মিলনমেলা।

এই উৎসব পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। নাম ভিন্ন হলেও অনুভূতি এক চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু, মুরংদের চাংক্রান, খুমিদের চাংলান, সাওতালদের পাতা এবং গুর্খা বা অসমীয়াদের বিহু, সবই নতুন বছরের আহ্বান ও ঐক্যের প্রতীক।

রোববার সকালে রাঙ্গামাটির ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ী ঘাটে বৈসাবি উদযাপন কমিটির উদ্যোগে তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। একই সময়ে গর্জনতলীতে ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসাবি উৎসব উদ্বোধন করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ।

উৎসব ঘিরে পুরো রাঙ্গামাটি শহর এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। হ্রদের তীর, পাহাড়ি রাস্তা, নৌকা ঘাট, সব জায়গায় মানুষের ভিড়। দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা এই অনন্য সংস্কৃতি দেখতে ভিড় করছেন। নৌভ্রমণ, পাহাড়ি খাবার, ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান—সব মিলিয়ে এক অনবদ্য উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

বৈসাবি উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, “এই উৎসব আমাদের আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমরা পুরাতন বছরের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন বছরের জন্য শান্তি, উন্নয়ন ও সম্প্রীতির প্রত্যাশা করি। পাহাড়ে সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধন আরও দৃঢ় হোক, এটাই আমাদের কামনা।”


রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সদস্য সাগরিকা রোয়াজা বলেন, “বৈসাবি আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে সবাই মিলেমিশে আনন্দ করে। এই উৎসব পাহাড়ের সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল প্রতীক।”

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, “বৈসাবি শুধু একটি উৎসব নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ঐক্যের প্রতিচ্ছবি। এই উৎসব পাহাড়ে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।”

মাইকেল ত্রিপুরা বলেন “বৈসাবি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি উৎসব। এটি আমাদের পরিচয়, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের ধারক। আমরা চাই, এই উৎসবের আনন্দ পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো দেশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক।”

ঢাকা থেকে আগত পর্যটক রাশেদ মাহমুদ বলেন, “এই উৎসব জীবনে প্রথম দেখলাম। ফুল ভাসানোর দৃশ্য, মানুষের আন্তরিকতা, পাহাড়ের পরিবেশ, সব মিলিয়ে এটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।”

উৎসবের ধারাবাহিকতায় ১৩ এপ্রিল পালিত হবে মূল বিজু। এদিন ঐতিহ্যবাহী ‘পাঁজন’ রান্না করে অতিথি আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হবে। ১৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে গোজ্যেপোজ্যে, যা পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আনুষ্ঠানিক বরণকে আরও বর্ণিল করে তুলবে।

পরবর্তীতে ১৫ এপ্রিল চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার এলাকায় এবং ১৭ এপ্রিল রাঙ্গামাটি চিং হ্লা মং মারি স্টেডিয়ামে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই জল উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।

মাসজুড়ে পাহাড়ের প্রতিটি গ্রামে চলবে এই উৎসবের ধারাবাহিকতা নাচ, গান, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও পারিবারিক মিলনমেলার মধ্য দিয়ে মুখর থাকবে পুরো অঞ্চল।

বিকে/মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন