Logo

সারাদেশ

প্লাস্টিকে কোণঠাসা

পিরোজপুরের ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প

Icon

পিরোজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ২০:২৫

পিরোজপুরের ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প

পালপাড়া

মাটির সোঁদা গন্ধে একসময় মুখরিত থাকতো পিরোজপুরের পালপাড়াগুলো। পহেলা বৈশাখ কিংবা গ্রামীণ মেলা এলে দম ফেলার সময় থাকতো না কারিগরদের। কিন্তু আজ সেই চাকা ঘোরার শব্দ স্তিমিত হয়ে আসছে। আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের বাজার দখল, কাঁচামালের চড়া দাম এবং ঋণের বোঝাসব মিলিয়ে পিরোজপুরের প্রায় দুইশ বছরের পুরনো মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সোনাকুড়ে প্রায় ২০০ বছর আগে শতাধিক পরিবার মাটির কাজ শুরু করেছিল। এরপর তা পিরোজপুর সদর, মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুরে ছড়িয়ে পড়ে। ৫০ বছর আগেও এ জেলায় কয়েক হাজার পরিবার এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

বর্তমানে ভাণ্ডারিয়া ও নাজিরপুরে এর প্রসার কমলেও সদর উপজেলার মূলগ্রাম, পালপাড়া, রানীপুর এবং কাউখালীর সোনাকুড়ে এখনও কিছু পরিবার এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে তাদের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে।

এক সময় পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মাটির হাঁড়ি, কলসি, সরা, রঙিন পুতুল ও খেলনা তৈরির যে ধুম পড়ত, এখন তা শুধুই স্মৃতি। কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর সহজলভ্যতায় মাটির খেলনার কদর একেবারে তলানিতে। বর্তমানে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এখন দইয়ের হাঁড়ি আর সাধারণ কিছু তৈজসপত্র।

সদর উপজেলার মূলগ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী বীরেন পাল আক্ষেপ করে বলেন, "আগে বৈশাখ এলে দিনরাত এক করে খেলনা আর হাড়ি-পাতিল বানাতাম। এখন প্লাস্টিকের ভিড়ে মাটির জিনিসের দাম নেই। মূল্য না পাওয়ায় পালেরা এখন এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।"

মৃৎশিল্পীরা এই পেশা ছেড়ে দেওয়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরেছেন এর মধ্যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলেও সস্তা হওয়ায় মানুষ প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। মাটি ও জ্বালানি কাঠের দাম বাড়লেও উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়েনি। এছাড়া সরকারি সুদবিহীন ঋণ না পেয়ে অনেক পরিবার চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়ছে। অপরদিকে আধুনিক কারিগরি শিক্ষা ও উন্নত যন্ত্রপাতির অভাবে মান্ধাতা আমলের চাকা ব্যবহার করেই কাজ করছেন তারা।

রানীপুর এলাকার ঝর্ণা রানী জানান, সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে মাত্র ২০০-২৫০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব।

রানীপুরের আরেক শিল্পী তপন পাল বলেন, "আমাদের ছেলেমেয়েরা আর এই কষ্টকর কাজে আসতে চায় না। সরকার যদি প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের প্রণোদনা দিত, তবেই হয়তো এই শিল্প বাঁচত।"

শিল্পটির করুণ দশা নিয়ে পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ বলেন, "ব্যবসায়ে লোকসান এবং চড়া সুদে ক্ষুদ্র ঋণে জড়িয়ে অনেক পরিবার এ পেশা ছেড়েছে। তবে বর্তমানে যারা এখনও এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের তালিকা করে সরকারি প্রণোদনা প্রদান এবং তাদের পণ্য বিপণনে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।"

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন