প্রতিকূলতা পেরিয়ে অর্থনীতির হাল ধরে রেখেছে চট্টগ্রাম বন্দর
আ ন ম সানাউল্লাহ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:১৬
ছবি: সংগৃহীত
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দিবস আগামী ২৫ এপ্রিল। দিবসটি উপলক্ষে বন্দরে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে বন্দরটির ভূমিকা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। শিল্পকারখানার কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য এবং তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি কার্যক্রম এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বন্দর সচল থাকাই উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই সমুদ্রবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৭ সালে পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্ট প্রণয়ন এবং ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল তা কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে কর্ণফুলী নদীর তীরে অস্থায়ী জেটির মাধ্যমে পণ্য ওঠানামা করা হলেও পরবর্তীতে স্থায়ী জেটি নির্মাণ, রেল সংযোগ স্থাপন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মাধ্যমে বন্দরটি ধাপে ধাপে বিকশিত হয়। ১৯২৬ সালে এটি মেজর পোর্ট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পাকিস্তান আমলে পোর্ট ট্রাস্টে এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে পোর্ট অথরিটিতে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-এর সময় বন্দরের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্ণফুলী নদীতে মাইন পুঁতে রাখা, জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া এবং স্থাপনা ধ্বংসের ফলে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক সহায়তা ও দেশীয় উদ্যোগে মাইন অপসারণ, নৌপথ সচলকরণ এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে বন্দর পুনরায় কার্যক্রমে ফিরে আসে। এই পুনরুদ্ধার দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগও বন্দরের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। উপকূলীয় অবস্থানের কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি সবসময়ই বিদ্যমান। বিশেষ করে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় বন্দরের অবকাঠামো ও কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে বন্দর দ্রুত কার্যক্রমে ফিরে আসে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিন ধরে ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কনটেইনার জট, জাহাজের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং লজিস্টিক সমস্যার কারণে কার্যক্রমে বিলম্ব দেখা দেয়। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন জেটি নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে এসব সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা হয়েছে। বর্তমানে জাহাজ খালাসের সময় হ্রাস পেয়েছে এবং সেবা দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি হলে চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা, শিল্পকারখানার কাঁচামাল দ্রুত খালাস এবং সরবরাহব্যবস্থা বজায় রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনা করে। কনটেইনার জট কমানো এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব অর্জন করছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচিত। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে এই বন্দরের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
বন্দর দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে র্যালি, আলোচনা সভা, কেক কাটা, দোয়া মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের প্রতিনিধিরা এসব আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি বন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিকূলতা, সংকট ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সক্ষমতা, চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় এই বন্দর দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

