উত্তরাঞ্চলের রেল-সেবায় অব্যবস্থাপনা, বাড়ছে অপরাধ
রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৮
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দেশের বৃহত্তম রেল জংশন দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেল জংশন বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত। একসময় উপমহাদেশজুড়ে খ্যাতিমান এই ঐতিহ্যবাহী স্টেশনটি আজ নানা সমস্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে যাত্রীসেবার মান তলানিতে নেমে এসেছে, পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে স্টেশনের আয়। প্রায় অর্ধলক্ষ জনসংখ্যার পার্বতীপুর শহরটি রেলপথ দ্বারা নতুন বাজার ও পুরাতন বাজার এই দুই অংশে বিভক্ত। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ঢাকা মোড় সংলগ্ন ১ নম্বর রেলগেটটি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষকে বিকল্প পথ না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি উঠলেও তা আজও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশনটি ১৮৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই জংশনের সুনাম একসময় সমগ্র ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে ব্রিটেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৩ বছরেও স্টেশনটির কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অবকাঠামো হয়েছে জরাজীর্ণ এবং সেবার মান হয়েছে নিম্নগামী।
পার্বতীপুর জংশনের গুরুত্ব কেবল রেল যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ নয় এটি ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও স্থাপনা। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি, মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প, ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেলওয়ের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা (কেলোকা), ডিজেল কারখানা, রেলহেড অয়েল ডিপো, বীর উত্তম শহীদ মাহবুব সেনানিবাস এবং বিদেশি মিশনারি পরিচালিত ল্যাম্ব হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এই জংশনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দেশি-বিদেশি যাত্রীদের কাছে এই স্টেশনটির গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই স্টেশন থেকে ৫টি রুটে পার্বতীপুর-দিনাজপুর, পার্বতীপুর-চিলাহাটি, পার্বতীপুর- লালমনিরহাট পার্বতীপুর-খুলনা-রাজশাহী এবং পার্বতীপুর-ঢাকা প্রতিদিন প্রায় ৪১টি আন্তঃনগর, মেইল ও লোকাল ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করেন। তবে যাত্রীসংখ্যার তুলনায় ট্রেনের আসনসংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় টিকিট সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক যাত্রী টিকিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে সড়কপথে যাতায়াত করছেন।
স্টেশনের সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় স্যানিটেশন ও পানির ব্যবস্থাপনায়। পাঁচটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে কোনো টয়লেট নেই। ফলে যাত্রীদের শহরের গণশৌচাগারের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের প্ল্যাটফর্মেই মলমূত্র ত্যাগ করতে দেখা যায়, যা পরিবেশ দূষণ ও দুর্গন্ধের সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটও যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বিশ্রামাগারগুলো অধিকাংশ সময় তালাবদ্ধ থাকে। ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ভিআইপি, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পৃথক বিশ্রামাগার থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সেগুলো চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত একটি বিশ্রামাগার ছাড়া প্রায় সবগুলোই অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার কারণে স্টেশন এলাকা দিন দিন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। মাদক ব্যবসা, চুরি, ছিনতাইসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড এখানে নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, হকার ও হিজড়াদের উৎপাতও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
স্টেশন মাস্টার মো. রফিক চৌধুরী বলেন,প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় আমরা পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছি না। ১২ জন সহকারী স্টেশন মাস্টারের স্থলে বর্তমানে মাত্র ৬ জন দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ৭০ জন গার্ডের বিপরীতে রয়েছে মাত্র ৪০ জন। এই সংকটের কারণে ট্রেন পরিচালনায়ও বিঘ্ন ঘটছে। তিনি আরও জানান, স্টেশনের প্রধান আয়ের উৎস মালামাল পরিবহন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৭-৮ বছর ধরে গুডস লাইনগুলো অচল থাকলেও তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে চাল, গম, পাথর ও কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্টেশনের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত স্টেশন ভবনটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়ে, দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনেও কোনো সংস্কার কাজ না হওয়ায় এটি যাত্রীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে কেলোকা পার্বতীপুরের প্রধান নির্বাহী শেখ হাসানুজ্জামান বলেন, এই জংশনের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত আধুনিকায়ন প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। আশা করছি কাজ শুরু হবে। তবে কবে নাগাদ শুরু হবে তা বলা যাচ্ছে না। রেলওয়ের উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ওয়ার্কস) মো. রাজা আলী শেখ বলেন, গুডস লাইনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। পার্বতীপুর রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুলফিকার আলী বলেন, নিরাপত্তা জোরদারে নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। মাদক ও অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত জনবল নিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং আধুনিকায়নের মাধ্যমে পার্বতীপুর রেল জংশনকে তার পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায় দেশের উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাবে এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের।
বিকে/মান্নান

