রাঙামাটিতে ছাত্রদলের দুই পক্ষে সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি
রাঙামাটি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ২০:০২
রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের নবগঠিত আংশিক কমিটিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং উত্তেজনার মুখে রাঙামাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে জেলা প্রশাসন।
সোমবার বিকেল থেকে শহরের বনরূপা, কাঁঠালতলী এবং পৌরসভা এলাকায় এই কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি রাজপথে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
গত শনিবার (২ মে) ছাত্রদলের কেন্দ্রীয়
সংসদ মো. অলি আহাদকে সভাপতি, নাঈমুল ইসলাম রনিকে সাধারণ সম্পাদক এবং গালিব হাসানকে
সাংগঠনিক সম্পাদক করে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের ২৩ সদস্যের একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করে।
দীর্ঘ ৮ বছর পর কমিটি গঠন করা হলেও এতে স্থানীয় ত্যাগী ও সক্রিয় অনেক নেতাকর্মীর নাম
না থাকায় অসন্তোষ দেখা দেয়। রোববার থেকেই এই কমিটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। পদবঞ্চিত
নেতাকর্মীরা রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার বিকেলে নতুন কমিটির আনন্দ মিছিল ও পদবঞ্চিতদের প্রতিরোধ কর্মসূচিকে
কেন্দ্র করে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা
গেছে, সোমবার বেলা ৩টার দিকে নবগঠিত কমিটির নেতাকর্মীরা রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণ থেকে
একটি আনন্দ মিছিল বের করার প্রস্তুতি নেন। অন্যদিকে, পদবঞ্চিত ও সংক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা
লাঠিসোঁটা এবং দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কাঁঠালতলীস্থ জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে
অবস্থান নেন। নতুন কমিটির মিছিলটি যখন বিএনপি কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হয়, তখন উভয় পক্ষ
মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুই পক্ষের
মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। উত্তেজিত কর্মীরা
সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী
আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে মো. ইউসুফ নামে এক পৌর যুবদল কর্মীর অবস্থা
গুরুতর বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় দ্রুত
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে সেনাবাহিনী
লাঠিচার্জ শুরু করলে দুই পক্ষ পিছু হটে। বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট
নিশাত শারমিন স্বাক্ষরিত এক আদেশে জরুরি ভিত্তিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
আদেশের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো- পৌরসভা,
কাঁঠালতলী ও বনরূপা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।
নির্ধারিত এলাকার ৪০০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের মিছিল, সভা বা সমাবেশ করা যাবে না। শব্দবর্ধক
যন্ত্র (মাইকিং) ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই
বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।
সহকারী পুলিশ সুপার ইকবাল হোছেন জানান,
"আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী
যৌথভাবে কাজ করছে। বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।"
ঘটনার পর জেলা বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত
এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিটির সভাপতি মো. অলি আহাদ বলেন, "দীর্ঘদিন পর কমিটি
হওয়ায় আবেগের বহিঃপ্রকাশ থেকে কিছু বিশৃঙ্খলা হতে পারে। যারা আজ সংক্ষুব্ধ, তারা আমাদের
দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা। তাদের অবদান আমরা অস্বীকার করছি না। যেহেতু এটি আংশিক কমিটি,
তাই পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যোগ্য সবাইকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। রাঙামাটি ছাত্রদলে কোনো
বিভেদ নেই।"
অন্যদিকে পদবঞ্চিত নেতাদের দাবি,
"যাদের নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে দেখা যায়নি, তাদের দিয়ে পকেট কমিটি গঠন
করা হয়েছে। ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে এই কমিটি গঠন করায় আমরা এটি প্রত্যাখ্যান
করেছি।" তারা অবিলম্বে এই কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
১৪৪ ধারা জারির পর থেকেই শহরের প্রধান
বাণিজ্যিক এলাকা বনরূপা ও কাঁঠালতলীর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ এবং পর্যটকরা
আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন
থাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক
এই অস্থিতিশীলতা বজায় থাকলে সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামবে।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
(ওসি) জসীম উদ্দিন জানান, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ১৪৪
ধারা অমান্যকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

