কুষ্টিয়ায় পোড়া মবিল থেকে তৈরি জ্বালানিতে সচল সেচ কার্যক্রম
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ২০:৪৫
দেশজুড়ে চলমান ডিজেল ও বিদ্যুৎ সংকট যখন কৃষি খাতকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে, ঠিক সেই সময় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার এক উদ্ভাবনী উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত কৃষকদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে ফেলে দেওয়া পোড়া মবিল থেকে ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি তৈরির দাবি করে আলোচনায় এসেছেন স্থানীয় উদ্ভাবক মনিরুল ইসলাম।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেচ কার্যক্রম পরিচালনায় ডিজেলের অভাব এবং বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিং কৃষকদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে মনিরুল ইসলামের উদ্ভাবনটি কৃষকদের মাঝে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
উদ্ভাবক মনিরুল ইসলাম জানান, বিশেষ ধরনের একটি বুস্টার উপাদান ব্যবহার করে তিনি পোড়া মবিলকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে ডিজেলের বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তর করছেন। তিনি এই প্রযুক্তির নাম দিয়েছেন ‘মেথড অব অলটারনেটিভ ডিজেল’ (ম্যাড)। তার দাবি অনুযায়ী, পোড়া মবিলের সঙ্গে মাত্র ১০০ মিলিগ্রাম বুস্টার মিশিয়েই এই জ্বালানি প্র¯‘ত করা সম্ভব, যা ডিজেলচালিত ইঞ্জিনে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এই মিশ্রণটি চারটি উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি, যা মূলত বুস্টার হিসেবে কাজ করে এবং জ্বালানির কার্যক্ষমতা বাড়ায়। দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরীক্ষার ফল হিসেবে এই পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেছেন তিনি। ইসলামের গবেষণার যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে, যখন তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি গবেষণায় মনোনিবেশ করেন।
চীনসহ বিভিন্ন দেশে কাজের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে কয়েক মাস আগে তিনি এর কার্যকর প্রয়োগে সফল হয়েছেন বলে দাবি করেন।
স্থানীয় কৃষক আকরাম হোসেন জানান, এই বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে ইতোমধ্যে তারা সেচ কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হ”েছন। তিনি বলেন, পাঁচ লিটার পোড়া মবিলের সঙ্গে ১০০ মিলিগ্রাম বুস্টার মিশিয়ে প্রায় সাত লিটার ডিজেলের সমপরিমাণ কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে। এতে খরচ কমছে এবং সংকটের মধ্যেও সেচ চালানো সম্ভব হচ্ছে।”
তবে বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। হোসেনাবাদ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ফার্ম মেশিনারি বিভাগের প্রধান জাহিদুল হক বলেন, উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে উদ্ভাবনী এবং সাশ্রয়ী। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ইঞ্জিনের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও যাচাই।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভিন জানান, কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে এই জ্বালানির কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যদি এটি কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হয়, তাহলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, “বর্তমান ডিজেল সংকট ও বিদ্যুৎ সমস্যার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উদ্ভাবন অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সম্ভাবনাময়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের এই ক্রান্তিকালে মনিরুল ইসলামের এই উদ্ভাবন সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা কৃষি খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশের বিকল্প জ্বালানি খাতেও নতুন দিগন্তের সূচনা করতে সক্ষম হতে পারে।
বিকে/মান্নান

