Logo

সারাদেশ

বাউফলে তেঁতুলিয়া নদী এখন মৃত্যুফাঁদ

Icon

বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬, ২১:১৮

বাউফলে তেঁতুলিয়া নদী  এখন মৃত্যুফাঁদ

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিচ্ছিন্ন জনপদ চন্দ্রদ্বীপ। তেঁতুলিয়া নদীর ওপারে চর ব্যারেট, চর রায়সাহেব, চর মিয়াযান, মধ্যে মিয়াযান, চর দিয়ারা, চর কচুয়া, চর ওয়াডেল, চর নিমদি, চর ফ্যাডা রওশন, চর আলগী ও ভাড়ানীরচরসহ ১১টি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা এই ইউনিয়নে বাস প্রায় ৩০ হাজার মানুষের। কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ এই জনপদে সবচেয়ে বড় সংকট এখন স্বাস্থ্যসেবা। স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসাসেবার অভাবে প্রতিবছর কয়েকজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

বাউফল সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের এই ইউনিয়নে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত নৌকা। সাধারণ সময়ে যাতায়াত সম্ভব হলেও জরুরি মুহূর্তে সেটিই হয়ে ওঠে বিপদের কারণ। প্রসূতি মা, স্ট্রোক কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে নিতে পাড়ি দিতে হয় উত্তাল তেঁতুলিয়া নদী। সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান।


স্থানীয়দের দাবি, প্রতি বছর গড়ে ৫ থেকে ৭ জন মানুষ শুধু চিকিৎসাসেবা না পেয়ে বা হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যান। বর্ষা কিংবা দুর্যোগের সময় নৌ চলাচল বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তবে এসব মৃত্যুর কোনো সরকারি হিসাব নেই।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একটি ইউনিয়নে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ২০ হাজার মানুষের জন্য অন্তত তিনটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকার কথা। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং নিরাপদ প্রসবসেবা থাকার কথা থাকলেও চন্দ্রদ্বীপে বাস্তবতা ভিন্ন।

২০১৩ সালে ইউনিয়ন গঠিত হলেও এখানে এখনো ১৯৯৮ সালে স্থাপিত একটি মাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া আর কোনো স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই ক্লিনিকটিও এখন কার্যত অচল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেখানে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা, সেখানে একজন সিএইচসিপি ছাড়া বাকি সব পদ শূন্য। গত চার মাস ধরে সরকারি ওষুধ সরবরাহও বন্ধ রয়েছে। ফলে পুরো ইউনিয়নের মানুষ কার্যত চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে পড়েছেন।

চর ওয়াডেল গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম বলেন, অনেকবার দেখেছি, প্রসূতি মা কিংবা দুর্ঘটনায় আহত রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারার কারণে মাঝ নদীতেই মারা গেছেন। গত মাসেও জমিজমা নিয়ে সংঘর্ষে আহত উজ্জ্বল কর্মকারকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মাঝ নদীতে মারা যেতে হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জন্মদানের সময় বা পরে অন্তত ২৭টি শিশুসহ ৩০ থেকে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালে চরমিয়াজান গ্রামের লিমা আক্তার ঝুমুর সন্তান প্রসবের সময় মারা যান। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চর ওয়াডেলের মালেক মাঝী ও বিদ্যুৎকর্মী হাসনাইন হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রাণ হারান।

স্থানীয় বাসিন্দা বিউটি বেগম বলেন, ৩০ হাজার মানুষের জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকা শুধু অবহেলা নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

জহিরুল ইসলাম সোহাগ বলেন, এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই মৃত্যুঝুঁকি। বছরে ৫–৭টি মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

চর ওয়াডেল কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই এলাকায় অন্তত আরও দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স জরুরি প্রয়োজন।

তিনি জানান, ২০১৩ সাল থেকে একাধিকবার আবেদন করা হলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

একই ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী সোলাইমান বলেন, যেখানে ৬ জন স্বাস্থ্য সহকারী থাকার কথা, সেখানে আমি একাই কাজ করছি। ২৪টি আউটরিচ টিকাদান কেন্দ্রে একজন মাঠকর্মীও নেই। একজন কর্মী দিয়ে পুরো ইউনিয়ন কাভার করা অসম্ভব।

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল বসার মৃধা বলেন, দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি সরকারি হাইস্পিড বোটের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, একটি ক্লিনিক ছাড়া পুরো ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ১০ শয্যার হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালুর জন্য বিশেষ বরাদ্দের চেষ্টা চলছে।

পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, চন্দ্রদ্বীপের মতো দুর্গম এলাকায় বছরে অন্তত দুই মাস ভাসমান হাসপাতাল সেবা চালু থাকে। তবে গত চার মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি সত্য। তিনি আরও বলেন, জনবল ঘাটতির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং তা পূরণের চেষ্টা চলছে।

তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত এই জনপদে এখনো চিকিৎসা অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১০ শয্যার হাসপাতাল, মিডওয়াইফ নিয়োগ এবং একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালু করা হোক।

বিকে/মান্নান
Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন