উচ্ছ্বসিত নগরবাসীর আনন্দ মিছিল
বগুড়া সিটি করপোরেশন অনুমোদন, কে হচ্ছেন প্রশাসক!
দীপক সরকার, বগুড়া
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ২১:০৯
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠনের প্রস্তাব নিকার বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে । এ খবরে পুরো বগুড়াজুড়ে বইছে আনন্দের জোয়ার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়ী মহলে চলছে উচ্ছ্বাস, অভিনন্দনের বন্যা এবং আনন্দ মিছিল। সেই সাথে নব গঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নগরপিতা বা প্রশাসক কে হচ্ছেন এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই।
সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) এ বৈঠকে বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠনের প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিগগির এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
এ বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সিটি করপোরেশন। অবশেষে নিকার বৈঠকে সেটি অনুমোদন পেয়েছে। এজন্য বগুড়াবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’
এদিকে নিকারের বৈঠকে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন অনুমোদন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়ে শুক্রবার(৮ মে) বিকালে আনন্দ মিছিল করে জেলা বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন নগরী ও বাণিজ্যকেন্দ্র বগুড়া শহর পরিচালনার জন্য ১৮৭৬ সালের ১ জুলাই বগুড়া পৌরসভা গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এর আয়তন মাত্র ১.২৫ বর্গ মাইল ছিলো এবং জনসংখ্যা ছিলো মাত্র ৭ হাজার। এটি একটি ‘‘ক’’ শ্রেণির পৌরসভা এবং ২১ টি ওয়ার্ডে বিভক্ত। ২০০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বগুড়া পৌরসভার আয়তন বেড়ে ৬৯.৫৬ বর্গ কিলোমিটার করা হয়। এটিই ছিলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম পৌরসভা। বর্তমানে এই নগরীর লোক সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ।
তবে বৃটিশ শাসনামলে বগুড়া পৌরসভা গঠন করার পর প্রথম চেয়ারম্যান হন বৃটিশ নাগরিক ডব্লিউ ওয়াভেল। আর এই পৌরসভার শেষ চেয়ারম্যান ছিলেন এড. একএম মাহবুবর রহমান। এড. একেএম মাহবুবর রহমান প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। এর আগে ভারপ্রাপ্ত মেয়র ছিলেন ৫ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মরহুম সৈয়দ আনোয়ারুল ইসলাম বাবলা। বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও বগুড়া-৬ সদর আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা ছিলেন বগুড়া পৌরসভার শেষ নির্বাচিত মেয়র।
পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করতে ২০০৬ সালে বগুড়া পৌরসভাকে ১২ টি ওয়ার্ড থেকে ২১ টি ওয়ার্ডে উন্নীত করা হয়। আর আয়তন ১৪ বর্গ কিলোমিটার থেকে প্রায় ৭০ বর্গ কিলোমিটার করা হয়। মূলত ওই সময় বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় বগুড়া পৌরসভাকে বর্ধিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বগুড়া সিটি কর্পোরেশন হলো।
তাছাড়া সিটি কর্পোরেশন হওয়ার পথ সুগম হয় ২০২৪ এর আগস্টের পর থেকে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে এর তৎপরতা বেশি দেখা গেছে। ২০২৫ এর ২৪ ফেব্রুয়ারি বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে প্রাপ্ত পত্রের প্রেক্ষিতে বগুড়া পৌর এলাকায় সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) বিধিমালা,২০১০ এর বিধি-৫ অনুযায়ী গণবিজ্ঞপ্তি জারি এবং এলাকার অধিবাসীদের মতামত/আপত্তি নিষ্পত্তিপূর্বক চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
এদিকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর প্রশাসক পদ নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে দৌড়ঝাঁপের শেষ নেই। সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন সাবেক পৌর মেয়র ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম মাহবুবর রহমান, বিএনপির সাবেক সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চাঁন ও আলী আজগর তালুকদার হেনা, ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল, শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী হিরু, সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম খায়রুল বাশার, জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি এম আর ইসলাম স্বাধীন এবং জেলা যুবদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম।
বগুড়া শহর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু জানান, বগুড়ায় সিটি করপোরেশন চালানোর মতো দক্ষ নেতা অনেকে আছেন। তবে দল থেকে যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হবে। যিনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাবেন। তার সঙ্গে থেকে বগুড়া সিটিকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলার কাজ করব।
সিটি কর্পোরেশন (পুর্বতন পৌরসভার) প্রকৌশল শাখার তথ্যমতে জানা যায়, সিটি করপোরেশন হওয়ায় সড়ক, ড্রেনেজ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক সব খাতে চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বর্তমান পৌর কাঠামো সেই চাপ সামলানোর মতো নয়। শহরে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে সংগ্রহ করা যায় সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ টন। বাকি বর্জ্য পড়ে থাকে খোলা ড্রেন, খাল ও সড়কে। আধুনিক ল্যান্ডফিল বা বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্ট না থাকায় এই সমস্যা দীর্ঘদিনের।
ড্রেনেজ ব্যবস্থারও একই চিত্র। মোট ১২১০ কিলোমিটার ড্রেনের মধ্যে ৭৭০ কিলোমিটার কাঁচা ভাঙা বা অবরুদ্ধ। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সিটি করপোরেশন হিসেবে এই নেটওয়ার্ক বাড়ানো ও পুনর্গঠন জরুরি। সড়ক অবকাঠামোতেও ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ১৩৪০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৩৬৫ কিলোমিটার এখনও কাঁচা বা আধাপাকা। অনেক ওয়ার্ডেই উন্নত সড়ক সুবিধা নেই।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশন হওয়ায় এখন বড় পরিসরে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, সড়ক সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রিট লাইটিং ও ডিজিটাল নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাড়বে সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার সম্ভাবনাও।
সিটি কর্পোরেশনের যাত্রা শুরু হয়ে উচ্ছ্বসিত স্থানীয়রা মনে করছেন, বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ শহরের আধুনিক নগরায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, উন্নত ড্রেনেজ, সড়ক যোগাযোগ ও আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে।
বিকে/মান্নান

