উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পদ্মায় বালু লুট
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ২১:০৬
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে অবাধে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী চক্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দিনের পর দিন ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর গভীর থেকে বালু তোলা হলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। অস্ত্রধারী বাহিনীর পাহারায় পরিচালিত এ বালু বাণিজ্যের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি।
জানা গেছে, পদ্মা নদীর অংশে বালি উত্তোলনের ওপর উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা প্রকাশ্যে অমান্য করা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাত-দিন চলছে বালু কাটার মহোৎসব। প্রতিবাদ করলেই সাধারণ মানুষকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে আতঙ্কে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার একাধিক পয়েন্টে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে পদ্মার স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভয়াবহ তীরভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ইতোমধ্যে বহু ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালু ফেলায় আবাদি জমিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মরিচা ইউনিয়নের বৈরাগীরচর ভাদু শাহ মাজারসংলগ্ন এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঘেঁষে সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান, ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাদল হোসেন ভেগু ও টগর মোল্লার নেতৃত্বে বিজয়, শামীম রেজা, লতিফ ও হাবিবের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। এতে রাইটা-মহিষকুন্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা।
এছাড়াও মরিচা ইউনিয়নের ভুরকিরচর এলাকাতেও অবাধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে। এতে নদীভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে এবং চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষ।
মাজদিয়াড় গ্রামের নিচে পদ্মার চরে রবিউল ইসলাম ও সাবেক ইউপি সদস্য লিয়াকত সরদারের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বালুঘাট দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, কয়েক মাস আগে এ বিরোধের জেরে রবিউল ইসলাম তার লোকজন নিয়ে লিয়াকত সরদারের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালান। পরে গত ২০ এপ্রিল দিবাগত রাতে মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়ার গ্রামে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রবিউল ইসলামের ওপর ব্রাশফায়ার ও শর্টগানের গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে নারী-পুরুষসহ অন্তত ১১ জন গুলিবিদ্ধ হন।
এদিকে বৈরাগীর চর ঠান্টিতলা ও ভুরকির চর এলাকায় টুকু ও রাসেলের নেতৃত্বেও অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বেপরোয়া এ বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙন বাড়ছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।
শুধু নদী থেকেই নয়, পদ্মায় জেগে ওঠা চরের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকেও জোরপূর্বক বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। জমির মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাতের আঁধারে শত শত ট্রলি বালু কেটে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, প্রতিদিন শত শত ট্রলি বালু বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। প্রতি স্টিয়ারিং গাড়ি বালু ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উপজেলার মথুরাপুর, হোসেনাবাদ, তারাগুনিয়া ও আল্লাদর্গা এলাকা থেকে আসা শত শত স্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলি দিন-রাত পদ্মা থেকে বালু পরিবহন করছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ট্রলি থেকে আরও ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে বিজয়।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ‘মেসার্স সরকার ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ অবৈধ বালি ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় বৈধভাবে ২৪ একর জমিতে বালি উত্তোলনের ইজারা পেলেও সেখানে পর্যাপ্ত বালু না থাকায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ও ফিলিপনগর এলাকার চৌদ্দহাজার মৌজায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিকে/মান্নান

