সীতাকুণ্ডে
অবহেলায় বিলীন হতে বসেছে ব্রিটিশ আমলের টিবি হাসপাতাল
এম জামশেদ আলম, সীতাকুণ্ড
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ২০:৫৪
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা রেলস্টেশনের পাশের পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বক্ষব্যাধি (টিবি) হাসপাতাল ও স্যানিটোরিয়ামটি একসময় ছিল যক্ষা রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র। অথচ অবহেলা, অরক্ষিত অবস্থা ও দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ সেটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত এই হাসপাতাল বর্তমানে জুয়াড়ি, মাদকসেবী ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। নির্জন পাহাড়ি পরিবেশের সুযোগ নিয়ে সন্ধ্যার পর সেখানে বেড়ে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত লোকজনের আনাগোনা। ফলে আশপাশের বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যক্ষা রোগের চিকিৎসাসেবার জন্য প্রায় ১৩ একর পাহাড়ি এলাকায় হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়। ব্রিটিশ আমলে নির্মাণকাজ শুরু হলেও ১৯৫৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম চালু হয়। পাহাড়ের নির্মল পরিবেশ, খোলা বাতাস এবং বিশেষ স্থাপত্য নকশার কারণে এটি ছিল সে সময়ের একটি আধুনিক স্বাস্থ্যনিবাস। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য এখানে আসতেন।
বিশাল বারান্দা, লম্বা করিডোর, উঁচু ছাদ এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের সুবিধা হাসপাতালটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর সুস্থতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি ছিল বিশেষভাবে পরিচিত। তবে দেশে যক্ষা রোগের প্রকোপ কমে আসা এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসারের ফলে হাসপাতালটির প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালে এর
কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য অবকাঠামো চট্টগ্রামের
সিআরবি রেলওয়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে পুরো স্থাপনাটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের
অধিকাংশ ভবন ঘন জঙ্গল ও আগাছায় ঢেকে গেছে। বিভিন্ন দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে,
অনেক স্থানে ছাদের অংশ ধসে পড়েছে। দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকায় দরজা-জানালা, কাঠ, রডসহ বিভিন্ন
নির্মাণসামগ্রীও চুরি হয়ে গেছে। এক সময়ের আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রটি এখন যেন ধ্বংসস্তূপে
পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এটি শুধু একটি
হাসপাতাল নয়; দেশের চিকিৎসা ইতিহাস, রেলওয়ে ঐতিহ্য এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ
স্মারক। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে স্থানটি হেরিটেজ স্পট, গবেষণা কেন্দ্র
কিংবা পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এলাকার সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ হাসপাতালটি
সংস্কার করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
তাদের মতে, এতে একদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে অবহেলিত প্রবীণ নাগরিকদের
জন্য একটি কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।
নির্জনতা ও জরাজীর্ণ পরিবেশের কারণে অনেকের
কাছে স্থানটি ‘হান্টেড স্পট’
হিসেবে পরিচিতি পেলেও ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় গবেষকদের মতে, এটি কোনো রহস্যময় স্থান নয়;
বরং দেশের চিকিৎসা ও রেলওয়ে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষ্য বহনকারী একটি
মূল্যবান স্থাপনা।
স্থানীয়রা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তাদের দাবি, দ্রুত হাসপাতালটিকে সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে সংস্কার, নিরাপত্তা
নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে
থাকা এই নীরব স্থাপনাটি যেন আজও অতীতের গল্প শোনায়। প্রশ্ন একটাই—অবহেলায় কি হারিয়ে
যাবে ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ, নাকি সংরক্ষণের উদ্যোগে নতুন প্রাণ ফিরে পাবে ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এই শতবর্ষী ঐতিহ্য?
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

