নাটোরে পাটের বাম্পার ফলনেও স্বস্তি নেই, কমছে দাম
গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫৬
মাঠজুড়ে সোনালি আঁশের সমারোহ। কোথাও জাগ থেকে তোলা হচ্ছে পাট, কোথাও চলছে শুকানো। আবার ভ্যানভর্তি পাট যাচ্ছে হাটের পথে। অনুকূল আবহাওয়া আর কৃষকের নিরলস পরিশ্রমে এ বছর নাটোরের গুরুদাসপুরে আশাতীত পাটের ফলন হয়েছে। কিন্তু সেই সোনালি আঁশ এখন কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারছে না। কারণ মৌসুমের শুরুতেই বাজারে পাটের দর কমে গেছে।
কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রতি মণে দাম কমেছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। এতে উৎপাদন খরচ নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে কয়েক দিন আগেও প্রতি মণ পাট বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে একই পাট বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। হঠাৎ এমন দরপতনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মৌসুমের শুরুতে পাট বিক্রি করতে আসা কৃষকরা।
মঙ্গলবার সকালে উপজেলার অন্যতম বৃহৎ পাটের মোকাম চাঁচকৈড় বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষকেরা পাট নিয়ে ভিড় করেছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করেছেন। অন্তত ১০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান বাজারদরে পাট বিক্রি করলে উৎপাদন খরচ ওঠানোই
কঠিন হয়ে পড়বে। পৌর সদরের তালুকদারপাড়ার কৃষক রফিকুল, কালাকান্দর গ্রামের কমেদ আলী, শ্রীপুরের মকবুল হোসেন, বামনবাড়িয়ার মতি মিয়াসহ কয়েকজন কৃষক বলেন- ‘‘একজন শ্রমিককে এখন দৈনিক সর্বনিম্ন ৭০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক ছাড়াও প্রতি বিঘা জমিতে পাট কাটা ও ধোয়ার কাজে ৫ থেকে ৮ জন শ্রমিক প্রয়োজন হয়।
জমি লিজ, বীজ, সার, চাষ, নিরানি, পাট কাটা, পরিবহন, ধোয়া ও শুকানোর খরচ মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। প্রতি বিঘায় গড়ে সাতমণ পাট উৎপাদন হলেও বর্তমান বাজারদরে সেই খরচই তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’’
তাদের ভাষ্যমতে, গত বছর পাটের ভালো দাম পাওয়ায় এবার অনেকেই আবাদবাড়িয়েছিলেন। ফলনও হয়েছে ভালো। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই দরপতনে সব আশা ম্লান হয়ে গেছে। কৃষকদের দাবি, সরকার বিদেশে পাট রপ্তানির সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করলে তারা এ সংকট থেকে উত্তরণ পাবেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে গুরুদাসপুরে ৫ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় যা ৫১০ হেক্টর বেশি।
গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা এ বছর পাট চাষে বেশি আগ্রহী হন। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলনও হয়েছে সন্তোষজনক। তবে বাজারে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের আনন্দে এখন দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এসেছে।
চাঁচকৈড় হাটের পাট ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক মোল্লা, হান্নান শেখ, আশিক
শেখ, আব্দুর রশিদ হাজী, আসাদুল ইসলাম, ইসমাইল হোসেন ঠান্টু ও শামিম রেজা বলেন, গত বছরের তুলনায় নতুন পাট বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তারা মিল মালিকদের নির্ধারিত দরে পাট কেনেন। যেসব দেশ বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানি করে, তাদের কয়েকটি দেশ এবার পাট কিনছে না। ফলে দেশীয় পাটকলের চাহিদা অনুযায়ী
যাচাই-বাছাই করে পাট কিনতে হচ্ছে। তাদের মতে, বাজারে কিছুটা চাপ থাকলেও দেশীয় চাহিদা অনুযায়ী কেনাবেচা চলছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম রাফিউল ইসলাম বলেন, “পাট বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। গুরুদাসপুরে দেশি তোষা, মেস্তা ও জেআরও জাতের পাটের আবা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শে কৃষকরা ভালো ফলন পেয়েছেন। তবে দামে পুষিয়ে উঠবেন কৃষকরা।”
বিকে/মান্নান

