Logo

সারাদেশ

অনিয়মের আখড়া লক্ষিচাপ দারুস সুন্নত দাখিল মাদরাসা

Icon

নীলফামারী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ২০:১৭

অনিয়মের আখড়া লক্ষিচাপ দারুস   সুন্নত দাখিল মাদরাসা

নীলফামারী সদরের লক্ষিচাপ ইউনিয়নের লক্ষিচাপ দরগাবন্দ দারুস সুন্নত (ডিএস) দাখিল মাদরাসায় শিক্ষার্থী সংকট, নিয়োগ বাণিজ্য ও বিলে সই করতে ইচ্ছাকৃত দেরি ও শিক্ষককে মানুষিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে সুপারের বিরুদ্ধে। এটি যেন মাদরাসা নয়, অনিয়মের আকড়া।

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এমপিও ভুক্ত হয়, ১৯৮০ সালের জানুয়ারী মাসে। ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা ১৭ জন। এরমধ্যে শিক্ষক ১২ জন ও কর্মচারী ৫ জন। সেখানে কাগজে কলমে ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৩২০ জন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮-২০ জন। এরমধ্যে ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী শ্রেণী কক্ষে উপস্থিত রয়েছে মাত্র পাঁচজন । ওই শ্রেণীর হাজিরা খাতায় কাগজে কলমে ভর্তি দেখানো হয়েছে ৪৩জন। এছাড়াও, চলতি মাসের ২৫ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত শতভাগ উপস্থিতি (রোল কল) দেখিয়েছে শিক্ষকরা। এর কারণ জানতে চাইলে সৎউত্তর দিতে পারেনি সুপার।

পাশাপশি ৮ম শ্রেণীতে একজন শিক্ষার্থী ক্লাস রুমে দেখা গেছে, ওই শিক্ষার্থী জানান, স্যারদের সারাদিনে ক্লাস নেওয়ার কথা সাতটি, সেখানে ক্লাস হয় দুই থেকে তিনটি। টিফিনের পরেতো ক্লাসই হয় না। মাদরাসা প্রতিদিন দুইটার দিকে ছুটি হয়। এভাবেই চলে আমাদের মাদরাসা।

অপরদিকে, এবতেদায়ি শাখারও বেহাল দশা। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত কোন শিক্ষার্থী নাই। ওই শাখার সহকারী শিক্ষক আজগার আলী ও রিতা রানী রায় বলেন, আমরা বাড়ী বাড়ী গিয়ে অভিভাবকদের সাথে কথা বলেছি ও তাদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়েছি। তারপরেও ছাত্র/ছাত্রী না এলে আমরা কি করতে পারি। তবে চেষ্টা চলছে প্রতিষ্ঠানকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে৷ ওই শাখাও ছাত্র শিক্ষকের ভূয়া উপস্থিতি খাতায় দেখানো হয়েছে। অথচ সেখানে ছাত্রতো দূরের কথা চেয়ার টেবিলের কোন অস্থিত্ব পাওয়া যায়নি।

শ্রেণীকক্ষের বেঞ্চগুলোতে ধুলোর আস্তর জমে আছে। শিক্ষার্থী না থাকায় শ্রেণিকক্ষে বসে খোশ গল্প করছেন শিক্ষকরা । এক প্রশ্নের জবাবে তাঁরা বলেন, আমরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছি। এতে কোন সমস্যা নেই। এবতেদায়ি শাখার শুরু থেকেই বেহাল দশা।”

প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (অফিসার) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মাদরাসার সহকারী শিক্ষক (বাংলা) হাসনাহেনা চৌধুরী।

অভিযোগে বলা হয়, শিক্ষকদের মানসিক নির্যাতন ও বেতন বিলে সই না করে হয়রানি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী  উপস্থিতি না থাকা সত্বেও শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে হাজিরা খাতায় ভুয়া উপস্থিতি দেখাতে বাধ্য করা হয়।

এছাড়া চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সহিদার একটি বেসরকারী মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ধরে এনে এই মাদরাসায় রেজিস্ট্রেশন করিয়ে জালিয়াতি করা হচ্ছে। এছাড়াও, নতুন কর্মচারী নিয়োগের নামে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক জানান, এবতেদায়ি ও দাখিল শাখার বেহাল দশা। মাদরাসার শিক্ষক কর্মচারী, অবকাঠামো, চেয়ার-টেবিল সবই আছে। কিন্তু শুধু নেই শিক্ষার্থী। কিভাবে তারা সরকারের টাকা পকেটস্থ করছেন এর জবাব কে নিবে।

জমি দাতা রবিউল ইসলাম জানান, চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা মাদরাসা থেকে বিমুখ হয়েছে। আর এখন অভিভাবকরাও সচেতন। যেখানে শিক্ষার গুনগতমান ভাল, অভিভাবকরা সেখানেই বাচ্চা পাঠাবে। একারণেই মাদরসার ছাত্র/ছাত্রীর উপস্থিতি নাই বললেই চলে। তিনি বলেন, বর্তমানে ১৮ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী যাওয়া আসা করেন। তবে হাজিরা খাতায় শতভাগ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখানো হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী শূন্য প্রতিষ্ঠানে কীভাবে শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা হয়, সেটি আমার বোধগম্য নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থী নেই, আশেপাশে অনেক এনজিও, মসজিদ ভিত্তিক ও মন্দির ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠায় বাচ্চারা মাদরাসায় আসে না। আমাদের চাকুরির জন্য আসতেই হয়।

আরেক শিক্ষক বলেন, এটা অস্বীকার করার কিছুই নেই, প্রতিটি ক্লাসে দুই থেকে তিন জন করে শিক্ষার্থী আছে,  তাও আবার অনেকেই আসেনা। মাদরাসার সার্বিক অবস্থা ভাল না। তাই এখানে কেউ ছেলে মেয়ে দেয় না।

জানতে চাইলে মাদ্রাসার সুপার মাওলানা মো. মাহমুদুল হাসান আফেন্দি বলেন, “আমি ১৯৮৮সালে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। পরে সুপার পদে পদোন্নতি পাই। নানা জটিলতার কারণে মাদরাসাটির এখন বেহাল অবস্থা। আমরা চেষ্টা করছি, আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। আগামী মাসের ৩ তারিখ অভিভাবক মিটিং ডাকা হয়েছে।

এছাড়াও, “পাশেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সেখানে বাচ্চারা বিস্কুটসহ নানা সুযোগ সুবিধা পায়, একারণে এবতেদায়িসহ দাখিলে শিক্ষার্থী কম। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আগের জায়গায় ফিরতে। ভূয়া ছাত্র হাজিরার বিষয় জানতে চাইলে বলেন, শ্রেনী শিক্ষকরা হাজিরা খাতায় ভূয়া হাজিরা দেওয়া ঠিক করেনি। তবে এর দায়ভার তাদেরই নিতে হবে। এক পর্যায়ে একজন শিক্ষক আরেকজনের কাঁধে দায় চাপানোর চেষ্টা করেন।”

নীলফামারী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানান, “আগে কেউ বিষয়টি জানায়নি। তবে এব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।”

বিকে/মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন