Logo

সারাদেশ

উলিপুরে নদীভাঙনে বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় বিধবা জসদা রানী

Icon

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৫৩

উলিপুরে নদীভাঙনে বসতভিটা হারানোর   শঙ্কায় বিধবা জসদা রানী


‘হামার বাড়ি তিস্তা নদীত ভাঙি যায় বাহে, বাঁচান।’ তিস্তার করালগ্রাসে বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় এমন আকুতি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের হোকডাঙ্গা মাঝিপাড়া এলাকার বিধবা জসদা রানীর (৭০)। কয়েক দিনের নদীভাঙনে তার আট শতক বসতভিটার ছয় শতকই ইতোমধ্যে তিস্তায় বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট সামান্য জায়গাটুকু আঁকড়ে ধরে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

জসদা রানীর পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি তার ছেলে সুশান্ত চন্দ্র দাস। নদীতে মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেই কোনো রকমে সংসারের ব্যয় মেটান তিনি। শেষ সম্বলটুকুও নদীতে চলে গেলে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়বে। শুধু জসদা রানীর পরিবার নয়, একই এলাকায় আরও চার থেকে পাঁচটি পরিবারও রয়েছে ভাঙনের সরাসরি ঝুঁকিতে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দেড় মাস আগে বসতভিটা রক্ষায় কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে ওই এলাকায় কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়। তবে পাড়ের নিচ থেকে পাইলিং না করায় তিস্তার প্রবল স্রোতে সেগুলো নির্ধারিত স্থান থেকে সরে গেছে। এতে নদীর স্রোত তীরের মাটি ধুয়ে নিয়ে যাওয়ায় ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। তাদের দাবি, শুধু জিও ব্যাগ না ফেলে নদীর তলদেশ থেকে তীর পর্যন্ত পাইলিং করে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

সরেজমিনে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেতরাই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝিপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে একের পর এক তীরের মাটি ধসে পড়ছে। জসদা রানীর আট শতক বসতভিটার ছয় শতক ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। অবশিষ্ট দুই শতক জায়গায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন পরিবারের সদস্যরা। রাত নামলেই নদীভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম সময় কাটে তাদের। আশপাশের আরও কয়েকটি পরিবারও একই শঙ্কায় রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, গত দেড় মাস আগে পাউবো ওই এলাকায় জিও ব্যাগ ফেললেও পাইলিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে স্রোতের চাপে বস্তাগুলোর নিচের মাটি সরে গিয়ে জিও ব্যাগগুলোও নদীর দিকে ভেসে যাচ্ছে। এতে ভাঙন ঠেকানোর পরিবর্তে তীর রক্ষা কার্যক্রম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

স্থানীয়রা আরও জানান, গত বছরও তিস্তার ভাঙনে এ এলাকার প্রায় ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। ঘরবাড়ি হারানো এসব পরিবারের অনেকেই বর্তমানে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এবার নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় নদীতীরবর্তী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জসদা রানী বলেন, ‘কয়েক দিনের ভাঙনে হামার আট শতক জমির ছয় শতকই নদী নিয়া গেছে। বাকি জমিটুকুতে পরিবার নিয়া কোনোমতে আছি। হামার একমাত্র কর্মক্ষম সন্তান সুশান্ত নদীত মাছ ধরে সংসার চালায়। এই ভিটেটুকুই হামার সম্বল। এটুকুও যদি তিস্তা নিয়া যায়, তাহলে হামরা কোথায় যাবো?’ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘সবাই হামাক বাঁচান, হামার বাড়ি তিস্তা নিয়া যাচ্ছে।’

হুমকির মুখে থাকা বাবলু চন্দ্র দাস, পঁচা চন্দ্র দাস, গোপাল চন্দ্র দাস, পুদিরাম চন্দ্র দাস, দুলাল চন্দ্র দাস, মমিনুল ইসলাম ও বেলাল মিয়াসহ স্থানীয়রা বলেন, তিস্তার পানি ও স্রোতের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও তীব্র হচ্ছে। সামান্য কিছু জিও ব্যাগ পাড়ের নিচে ফেলা হলেও সেগুলো স্রোতের তোড়ে সরে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, পাইলিং ছাড়া এভাবে জিও ব্যাগ ফেললে বসতভিটা রক্ষা করা সম্ভব নয়। দ্রুত পাইলিংসহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

উলিপুর উপজেলার বজরা, গুনাইগাছ, থেতরাই ও দলদলিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তিস্তা নদীবেষ্টিত। এসব ইউনিয়নের পশ্চিম বজরা, চর বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া, দামারহাট, খামার দামারহাট, সাতালস্ক, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক, টিটমা, গোড়াইপিয়ার, শেখেরটেক, পাকার মাথা, দড়ি কিশোরপুর, বামনপাড়া, কুমারপাড়া, ভেন্ডারপাড়া, ফকিরপাড়া, ঠুটাপাইকার, কর্পুরা, লাল মসজিদ, অর্জুন ও রকিদেবসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন রয়েছে। এসব এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে সরকারি উদ্যোগে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও কয়েকটি স্থানে এখনও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে থেতরাই ইউনিয়নের মাঝিপাড়া অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, হোকডাঙ্গা মাঝিপাড়া এলাকায় তিস্তার ভাঙনের বিষয়টি তার জানা রয়েছে। পাউবোর লোকজন নিয়মিত ওই এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন। ভাঙন প্রতিরোধে ছয় হাজার জিও ব্যাগের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পাইলিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফ বলেন, তিস্তার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহি বলেন, থেতরাই ইউনিয়নের মাঝিপাড়া এলাকায় তিস্তার ভাঙনের বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। ভাঙনকবলিত এলাকায় লোক পাঠিয়ে পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিকে/মান্নান


Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন