ভালুকার বটতলায় এখনো বসে নরসুন্দরদের হাট
রোমান আহমেদ নকিব, ভালুকা (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৪৩
এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে চিরুনি। সামনে ছোট্ট পুরোনো আয়না। মাথার ওপর ছায়া মেলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বটগাছ। কাচঘেরা আধুনিক সেলুনের ঝলমলে আলো থেকে দূরে, খোলা আকাশের নিচে এভাবেই প্রতি শনিবার বসে নরসুন্দরদের ‘হাট’। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ী বাজারে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এই আয়োজন।
শনিবার এলেই মল্লিকবাড়ী বাজারে বাড়ে মানুষের ভিড়। সকাল থেকে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা, দোকানপাটের ব্যস্ততা আর হাটের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই বটগাছের নিচে বসেন কয়েকজন নরসুন্দর। পুরোনো কাঠের বেঞ্চ, আয়না, কাঁচি ও চিরুনি—এই সামান্য সরঞ্জামেই চলে তাঁদের কাজ।
শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন আধুনিক সেলুনের সংখ্যা বেড়েছে। কাচঘেরা দোকান, বৈদ্যুতিক চেয়ার ও নানা ধরনের আধুনিক সরঞ্জামে সাজানো এসব সেলুনে মানুষের আগ্রহও রয়েছে। তবে মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলার নরসুন্দরদের প্রতি মানুষের টান এখনো ফুরিয়ে যায়নি। প্রতি শনিবার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকে এখানে এসে চুল-দাড়ি কাটান।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কম খরচে সেবা পাওয়ায় অনেকে বটতলার নরসুন্দরদের কাছে আসেন। আবার কারও কাছে এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বছরের পর বছর একই নরসুন্দরের কাছে চুল-দাড়ি কাটাতে কাটাতে অনেকের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও তৈরি হয়েছে।
এই বটগাছের নিচের জায়গাটি শুধু নরসুন্দরদের কর্মস্থল নয়, তাঁদের জীবনেরও একটি অংশ। তাঁদের কেউ ছোটবেলা থেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। কারও জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে কাঁচি-চিরুনির সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে বাজারের চেহারা বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন। বেড়েছে আধুনিক সেলুন। কিন্তু বটগাছের নিচে নরসুন্দরদের সেই পুরোনো আসর এখনো টিকে আছে।
নরসুন্দরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় শনিবার সকাল থেকেই তাঁদের সামনে খদ্দেরের দীর্ঘ সারি থাকত। দিনভর ব্যস্ত থাকত কাঁচি ও চিরুনি। এখন আগের মতো খদ্দের পাওয়া যায় না। আধুনিক সেলুনের সংখ্যা বাড়ায় তাঁদের কাজ কমেছে, কমেছে আয়ও।
তবে তরুণ প্রজন্মের সবাই এ পেশা থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। পাঁচগাঁও হাজির বাজার এলাকার সুমন শীলের বয়স ২৪ বছর। নিজের এলাকায় তাঁর একটি সেলুন রয়েছে। এরপরও প্রতি শনিবার তিনি মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলায় এসে বসেন।
সুমন শীল বলেন, নিজের এলাকায় সেলুন চালানোর পাশাপাশি শনিবার মল্লিকবাড়ী বাজারে বসেন তিনি। এখানে তাঁর পুরোনো কিছু খদ্দের রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই নিয়মিত তাঁর কাছে চুল-দাড়ি কাটাতে আসেন।
নেত্রকোনা এলাকার বাসিন্দা প্রবীণ নরসুন্দর কাশেম বলেন, ‘প্রতি শনিবার মল্লিকবাড়ী বাজারে এসে চুল ও দাড়ি কাটার কাজ করি। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে আগের মতো কাজ পাওয়া যায় না। বাজারের বিভিন্ন মোড়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সেলুন গড়ে ওঠায় পুরোনো পদ্ধতিতে কাজ করা নরসুন্দরদের কাছে খদ্দেরের সংখ্যা কমে গেছে। এরপরও নিয়মিত বাজারে এসে যতটুকু কাজ পাই, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসারের খরচ চালিয়ে নিচ্ছি।’
শ্রী অরুণ চন্দ্র শীল বলেন, ‘আমার দাদা ও বাবাও মল্লিকবাড়ী হাটে নরসুন্দরের কাজ করেছেন। তাঁদের দেখাদেখি আমিও প্রায় ৫০ বছর ধরে এই হাটে কাজ করে আসছি। প্রতি শনিবার মল্লিকবাড়ী হাটে বসি। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করায় এখানে আমার অনেক পুরোনো ও পরিচিত খদ্দের রয়েছেন। তাঁরা হাটে এসে আমার কাছেই চুল-দাড়ি কাটান। তিনি বলেন, ‘আমার চার মেয়ে। তিন মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে বিয়ে দিয়েছি। শনিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিন গ্রামের বিভিন্ন ছোট ছোট বাজারে গিয়ে কাজ করি। নরসুন্দরের এই পেশা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালিয়ে আসছি।’
মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলায় প্রায় ৬০ বছর ধরে চুল-দাড়ি কাটিয়ে আসছেন প্রবীণ কুদ্দুস আলী। তিনি বলেন, ‘একসময় ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে নিয়মিত এই বটগাছের নিচে এসে চুল কাটাতাম। তখন এই জায়গায় বেশ ভিড় থাকত। এখন ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। তারা আর এখানে আসে না, বাজারের আধুনিক সেলুনে গিয়ে চুল কাটায়।’
কুদ্দুস আলী বলেন, ‘আধুনিক সেলুনে চুল কাটাতে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অথচ এই বটগাছের নিচে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ টাকায় চুল কাটানো যায়।’
বটতলার নরসুন্দরদের কাছে শনিবারের হাটটি শুধু বাড়তি আয়ের সুযোগ নয়। সপ্তাহের অন্য দিন কেউ নিজের এলাকায় সেলুন চালান, কেউ আবার গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করেন। শনিবার মল্লিকবাড়ী বাজারে এসে তাঁরা পুরোনো খদ্দেরদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও পান।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, আধুনিক সেলুনে নানা সুবিধা থাকলেও বটগাছের নিচে বসে চুল-দাড়ি কাটানোর মধ্যে আলাদা স্বস্তি রয়েছে। এখানে পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। নরসুন্দরদের অনেকেই দীর্ঘদিনের পরিচিত হওয়ায় তাঁদের সঙ্গে সেবা নেওয়ার সম্পর্কটি অনেক সময় পারিবারিক পরিচয়ের মতো হয়ে গেছে।
একটি বটগাছ, কয়েকটি কাঁচি-চিরুনি, পুরোনো আয়না ও কাঠের টুল —এই সামান্য আয়োজনেই চলছে তাঁদের কাজ। নেই আধুনিক সেলুনের ঝলমলে আলো কিংবা দামি যন্ত্রপাতি। তবু এই জায়গাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলোতেও। অনেক পুরোনো পেশা হারিয়ে যাওয়ার পথে। মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলার নরসুন্দরদের কাজও আগের তুলনায় কমেছে। তারপরও জীবিকার প্রয়োজন ও পুরোনো খদ্দেরদের টানে তাঁরা এখনো এই জায়গাটি ধরে রেখেছেন।
শনিবারের হাট শেষে ধীরে ধীরে থেমে যায় কাঁচির টুংটাং শব্দ। গুছিয়ে রাখা হয় কাঁচি, চিরুনি আর পুরোনো আয়না। বটগাছের নিচে নেমে আসে নীরবতা। তবে পরের শনিবার আবারও বসবে সেই ছোট্ট ‘সেলুন’। আধুনিকতার চাপে কাজ কমলেও পুরোনো খদ্দেরের টান ও জীবিকার প্রয়োজনে টিকে আছে এই আসর। বটতলার নরসুন্দররা যেন ধরে রেখেছেন গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যেতে বসা এক টুকরো ঐতিহ
বিকে/মান্নান

