Logo

সারাদেশ

লালমনিরহাটে কৃষকদের সঞ্চয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে গ্রামের পাঠাগার

Icon

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩৮

অ
লালমনিরহাটে কৃষকদের সঞ্চয়ে   সমৃদ্ধ হচ্ছে গ্রামের পাঠাগার

দিনে কারও সঞ্চয় দুই টাকা, কারও পাঁচ, আবার কেউ জমা রাখেন ১০ থেকে ২০ টাকা। সংসারের খরচ মেটানোর পর সামান্য এই অর্থই জমা হচ্ছে মাটির ব্যাংকে। তিন মাস পর ব্যাংক ভেঙে সেই টাকা তুলে দেওয়া হয় গ্রামের পাঠাগারের উন্নয়নে। অঙ্কে ছোট হলেও এই সঞ্চয়ের প্রতিটি টাকায় মিশে আছে ভালোবাসা, বইয়ের প্রতি টান আর নতুন প্রজন্মের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের টিপার বাজার এলাকার ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’ ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ। পাঠাগারের উন্নয়ন, নতুন বই ও বাদ্যযন্ত্র কেনা এবং ভবনের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজে সহায়তা করতে মাটির ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন ২০টি কৃষক পরিবারের সদস্যরা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ উদ্যোগে এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা।

প্রতিটি মাটির ব্যাংকে তিন মাসে জমছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। সাধারণ মানুষের সামান্য সঞ্চয় একত্র হয়ে হয়ে উঠছে গ্রামের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম অবলম্বন।

২০১৪ সালে মাত্র ১০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল পাঠাগারটির। স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী জামাল হোসেনের উদ্যোগে একটি জীর্ণ টিনশেড ঘরে শুরু হয় এর কার্যক্রম। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় মানুষ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় পাঠাগারটিতে বইয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজারের বেশি। বর্তমানে এটি গ্রামের মানুষের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

পাঠাগারের নিজস্ব দ্বিতল ভবনের ভিত্তির ওপর ইতোমধ্যে একতলার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকার বেশি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ সহায়তা দিয়েছেন ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন এবং মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। বাকি অর্থ এসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে।

পাঠাগারটিতে শুধু বই পড়ার সুযোগই নেই, রয়েছে কম্পিউটার ব্যবহার ও সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থাও। শিশু-কিশোর ও তরুণেরা এখানে বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখে, সংগীতচর্চা করে এবং নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়।

স্থানীয় বাসিন্দা মেরিনা বেগম বলেন, পাঠাগারে বই পড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ ঘটছে। বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তাঁরা মাটির ব্যাংকে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করছেন, যাতে সেই অর্থ দিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতা করা যায়।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিমাই চন্দ্র রায় জানায়, তার মা মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখেন। তিন মাস পর সেই ব্যাংক পাঠাগারে নিয়ে আসা হয়। নিমাই বলে, ‘আমরা নিয়মিত পাঠাগারে আসি। এখানে বই পড়ি, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখি এবং সংগীতচর্চা করি।’

পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা জামাল হোসেন বলেন, ২০টি কৃষক পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেককে একটি করে মাটির ব্যাংক দিয়েছেন তিনি। তাঁদের এই উদ্যোগ তাঁকে অভিভূত করেছে। দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এভাবে সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। দ্রুতই নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের পাঠাগারের প্রতি এই মমত্ববোধই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বড় অনুপ্রেরণা।

সামান্য সঞ্চয়, অথচ স্বপ্ন অনেক বড়। মাটির ব্যাংকে জমা হওয়া প্রতিটি টাকা শুধু একটি পাঠাগারের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করছে না, বরং গ্রামীণ জনপদে বই পড়া, সংস্কৃতিচর্চা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশে সম্মিলিত উদ্যোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।

বিকে/মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন