সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার সম্পদ আড়াই হাজার কোটিতে
এম এম হাসান
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২০
গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
পুঁজিবাজারের বিনিয়োগের নিরাপদ ইনস্ট্রুমেন্ট বা পণ্য হলো মিউচুয়াল ফান্ড। বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের জন্য মিউচুয়াল ফান্ড জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে বেশি পরিচিত নয়, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কম। নানা অনিয়ম ও অর্থ তছরুপের ঘটনায় চরম আস্থাহীনতা বিরাজ করছে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে। তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বাজার মূল্য ধরে রাখতে পারছে না। প্রকৃত সম্পদ মূল্যের তুলনায় অনেক নিচে লেনদেন হচ্ছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার সম্পদ মূল্যের তালিকাভুক্ত ৩৬টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকার কমে। ফলে মুনাফা পাওয়া তো দূরের কথা, বিনিয়োগকারীদের মূলধনই ফেরত পাওয়ায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ডের এ অবস্থার পেছনে দীর্ঘদিনের বাজার মন্দা, ইক্যুইটিনির্ভর বিনিয়োগ কাঠামো এবং পূর্ববর্তী অনিয়মগুলোকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারের নিম্নমুখী প্রবণতার সঙ্গে ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি যুক্ত হওয়ায় ফান্ডগুলোর প্রকৃত সম্পদমূল্য নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল করেছে।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে বেশি ডিসকাউন্টে থাকা ফান্ডকে লিকুইডেশন বা ওপেন এন্ডে রূপান্তর, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির পারফরম্যান্স ও সুশাসন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সংকট কাটতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বাজার মন্দার পাশাপাশি দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে সৃষ্ট আস্থাহীনতাই মিউচুয়াল ফান্ড খাতের মূল সংকট। নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে ধীরে ধীরে এই খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অবস্থা : দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ৩৭টি। এর মধ্যে এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ড অবসায়নের ঘোষণা দিয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই একটি বাদে তালিকাভুক্ত ৩৬টি মিউচুয়াল ফান্ডের নিট সম্পদমূল্য চার হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি ফান্ডগুলোর শুরুর দিকের মূল্যে বা কস্ট প্রাইসের হিসেবে সম্মিলিতভাবে নিট সম্পদমূল্য ৬ হাজার ৩৮৭ কোটি ৮ লাখ টাকা। শুরুর মূল্যে তো নয়ই, বরং বর্তমান নিট সম্পদ মূল্যেও ফান্ডগুলোর ইউনিট লেনদেন হচ্ছে না।
ডিএসইর তথ্য বলছে, ফান্ডগুলোর বর্তমান সম্মিলিত বাজার মূল্য ২ হাজার ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এতে সাধারণ নিট সম্পদমূল্য থেকে বাজার মূল্যের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ নিট সম্পদমূল্য থেকে প্রায় অর্ধেক দামে লেনদেন হচ্ছে ফান্ডগুলোর ইউনিট। তারপরও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম, ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
বিনিয়োগ আরও কমার শঙ্কা : ফান্ডগুলোর অবসায়ন বা বিক্রি করলে কাগজ-কলমে যে সম্পদ আছে, তা ফেরত পাওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। কেননা এসব ইউনিটের বিপরীতে আন্ডারলাইড অ্যাসেট বা অন্তর্নিহিত সম্পদের মূল্যও আগের মতো নেই। কোনো বিনিয়োগ পুরোটাই আদায় অযোগ্য বা অনিশ্চিত। ফলে বিনিয়োগ কমে তলানিতে নেমে যাওয়ার সম্পূর্ণ আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএসই সাবেক পরিচালক ও দেশের শীর্ষস্থানীয় স্টক ব্রোকার মো. শাকিল রিজভী বলেন, ওইসব ফান্ডের বাজারমূল্য ২ হাজার কোটিও টিকবে কি না সন্দেহ আছে। কারণ, এখন পাঁচটা ব্যাংক বন্ধ। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে যদি ওইসব ব্যাংকের শেয়ার ১০ টাকা করে কেনা থাকে, আর যদি ২০০ কোটি বিনিয়োগ থাকে, সেইটারই বা কী হবে? অস্তিত্ব সংকটে থাকা লিজিং কোম্পানিগুলোও তো রয়েছে। সেসব বিনিয়োগও বিফলে যাবে।
মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বেহাল দশার কারণ : মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর এমন অবস্থার পেছনে পুঁজিবাজারের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং পূর্ববর্তী অনিয়মকে দায়ী করছেন বিশ্লেষক ও বাজারসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজারে বেশির ভাগই ইক্যুইটি নির্ভর মিউচুয়াল ফান্ড। যার কারণে পুঁজিবাজার ভালো করলে, মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ভালো করে, ভালো রিটার্ন দেখায়। বাজার খারাপ করলে মিউচুয়াল ফান্ডও খারাপ করে। যেহেতু পুঁজিবাজার নিম্নমুখী এবং রিটার্ন কম, তাই মিউচুয়াল ফান্ডগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। সেইসাথে যুক্ত হয়েছে পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা। তাছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডগুলোতে অতীতে বড় ধরনের অনিয়ম ও অর্থ তছরুপের ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনায় জড়িতদের দৃশ্যমান বিচার বা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। এসব কারণে এ খাতের ওপর মানুষের আস্থাহীনতা চরমে পৌঁছেছে।
জানতে চাইলে স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, মূলত আস্থার অভাব রয়েছে। সেইসঙ্গে ফান্ডগুলোর পারফরম্যান্সও খারাপ। আইন পরিবর্তন হয়েছে, আশা করা যায় খুব দ্রুতই মিউচুয়াল ফান্ড খাত এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে।
পুঁজিবাজারের নেতিবাচক অবস্থাও মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দুরবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করেন মো. শাকিল রিজভী। তিনি বলেন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির পারফরম্যান্স ভালো নয়। আবার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্সও খারাপ, মার্কেটও খারাপ-এসব মিলিয়েই বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে।
মিউচুয়াল ফান্ডের নতুন বিধিমালা : গত বছরের ৭ অক্টোবর পুঁজিবাজার সংস্কারের উদ্দেশ্যে টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সজেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। টাস্কফোর্স মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ বিএসইসির কাছে জমা দেয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও পর্যালোচনার পর গত ১৩ নভেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এই বিধিমালা কার্যকর হয়।
নতুন বিধি অনুযায়ী, আগামীতে কোনো ক্লোজ অ্যান্ড বা মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড অনুমোদন দেবে না বিএসসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যাতে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ লোপার করে পার না পায়, বিনিয়োগকারীরা অন্তত বিনিয়োগের নিরাপত্তা পান এবং এ খাতে আস্থা ফিরে আসে, সে জন্যই এ উদ্যোগ।
নতুন বিধিমালা অনুসারে, গেজেট প্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে যদি কোনো মিউচুয়াল ফান্ড নিট সম্পদমূল্য থেকে ২৫ শতাংশের বেশি কমে বাজারে বিক্রি হয়, তাহলে ফান্ডটির ট্রাস্টিকে ইউনিট হোল্ডারদের সঙ্গে মিটিং করতে হবে। মিটিংয়ে ইউনিটহোল্ডাররা সিদ্ধান্ত নেবে ফান্ডের অবসায়ন হবে না কি ওপেন এন্ড বা বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর করা হবে। অবসায়নে গেলে নিট সম্পদমূল্য ইউনিটহোল্ডার বা বিনিয়োগকারী পেয়ে যাবে।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম ব্যাখ্যা করে বলেন, ফান্ডের দাম যদি ৩ টাকাও হয়, তবু বিনিয়োগকারী ১০ টাকা পাবে। যদি তারা মনে করে যে, এই ফান্ডটা ভালো আছে, চলমান রাখব। তাহলে অবসায়ন না করে ওপেন এন্ডে যাবে।
কারণ হিসেবে আবুল কালাম বলেন, ওপেন এন্ডে গেলে বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন হলে সে ইউনিট জমা বা স্যারেন্ডার করে টাকাটা নিতে পারবে। ১০ টাকা থেকে ৩ টাকায় কেনাবেচা হবে না। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষার জন্যই আমরা এটা করেছি। মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে আরও কিছু বিধিনিষেধ সংযুক্ত করা হয়েছে নতুন আইনে। নতুন বিধিমতে, মিউচুয়াল ফান্ডের টাকা শুধু স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে। বিনিয়োগের পর মূল বোর্ড থেকে কোনো সিকিউরিটিজ তালিকাচ্যুত হলে, এটিবি কিংবা এসএমই বোর্ডে স্থানান্তরিত হলে তালিকাচ্যুতির ছয় মাসের মধ্যে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে হবে। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ ‘এ’ ক্যাটাগরির নিচের ক্রেডিট রেটিংসম্পন্ন কোনো বন্ড, ডেট সিকিউরিটিজ কিংবা ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে না।
বিকেপি/এমএইচএস

