Logo

অর্থনীতি

শূন্য হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের হাজার কোটি টাকার শেয়ার

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৪

শূন্য হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের হাজার কোটি টাকার শেয়ার

পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার পর এবার দুর্বল নয়টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে পাঁচ ব্যাংকের মতোই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখা হচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদমূল্য ঋণাত্মক হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা কোনো অর্থ ফেরত পাবেন না। ফলে বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ওই আট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার শূন্য হতে চলেছে। অভিহিত মূল্যে হিসাব করলে বিনিয়োগকারীরা হারাচ্ছেন প্রায় ১ হাজার ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এমনকি শেয়ারের গড় বাজারমূল্যেও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১০০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডার বা বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতে সুযোগ নেই। তবে লুটেরাদের অপরাধের সাজা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দেওয়া উচিত নয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপরাধ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা উচিত।

পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যেহেতু আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে, ফলে যারা সরল বিশ্বাসে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছিল, নিরীহ বিনিয়োগকারী, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। সরকার চাইলে সেটা দিতে পারেন।’

তথ্য বলছে, গত ৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর আওতায় নয়টি এনবিএফআই অবসায়নের (লিকুইডেট) সিদ্ধান্ত অনুমোদন পায়। 

নয়টি এনবিএফআই হলো- এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এবং আভিভা ফাইন্যান্স। এগুলোর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্স ছাড়া বাকিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক তথ্যমতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশ এই নয়টি প্রতিষ্ঠানের। গত বছরের শেষে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২৪ সালের শেষে করা হিসাব অনুযায়ী পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আটটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ৫০৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। গড়ে এই খেলাপির হার ৮৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

অনেক আমানতকারীর স্কিমের মেয়াদ শেষ হলেও তারা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। কেউ কেউ মাসের পর মাস, আবার কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষায় আছেন। আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর (নন-ভায়েবল) ঘোষণা করা হবে। এরপর ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও নেট অ্যাসেট ভ্যালু নির্ধারণ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘অডিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্পদের প্রকৃত ঘাটতির মাত্রা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

আমানতকারীদের পাওনা : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এক বছর আগের হিসাবে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুই ধরনের আমানতকারী মিলিয়ে নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার আমানত আটকে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা একক গ্রাহকের এবং ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা ব্যাংক ও করপোরেট আমানতকারীর।

একক আমানতকারীর আমানত আটকে থাকার দিক থেকে শীর্ষে আছে পিপলস লিজিং, প্রতিষ্ঠানটিতে ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা আটকে আছে। এরপর আছে আভিভা ফাইন্যান্স ৮০৯ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ৬৪৫ কোটি টাকা, প্রাইম ফাইন্যান্স ৩২৮ কোটি টাকা এবং এফএএস ফাইন্যান্স ১০৫ কোটি টাকা।

কিছুই পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা: অবসায়ন হতে যাওয়া নয়টির মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আটটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারপ্রতি গড় নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ৯৫ টাকা। এখান থেকে বোঝা যায়, সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের পক্ষে দায় পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব। সহজ ভাষায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ বিক্রি করে সব ঋণ শোধ করলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কিছুই থাকবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সম্পদমূল্য ঋণাত্মক হওয়ার কারণে শেয়ারহোল্ডাররা আইন অনুযায়ী কিছু পান না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, ‘সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান অবসায়নে গেলে আইন অনুযায়ী সম্পদ বিক্রি করে আগে আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ করা হয়, অন্যান্য দায় মিটিয়ে যদি কিছু থাকে, তাহলে শেয়ারধারীরা পান। এখানে যেহেতু সম্পদমূল্য ঋণাত্মক, সেহেতু মানবিক দিক বিবেচনা ছাড়া সাধারণত অর্থ ফেরতের সুযোগ নেই।’

বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আটটি এনবিএফআইয়ের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ৪৮৪ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার। উদ্যোক্তা ও পরিচালক বাদে এসব প্রতিষ্ঠানের ৬৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের হাতে, যার পরিমাণ ১০০ কোটি ৮৭ লাখ ৩৫ হাজার ৫১১টি। এসব শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হলে অভিহিত মূল্যের হিসাবে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। 

খেলাপি ঋণ, লুটপাট ও অনিয়মের চিত্র সামনে আসার পরে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমতে থাকে। বর্তমানে ওই আটটি প্রতিষ্ঠানের সবগুলোর শেয়ারদর ২ টাকার নিচে অবস্থান করছে, যার গড় বাজারদর ৯৮ পয়সা। শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হলে গড় বাজারমূল্যের হিসাবেও বিনিয়োগকারীদের ন্যূনতম ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০০ কোটি টাকা।

আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ : লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরুর আগে আমানতকারীদের টাকা ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার মৌখিক অনুমোদন দিয়েছে। তবে অর্থের পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘পাঁচটা ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, কিন্তু এনবিএফআই অবসায়ন করা হবে। এই নয় প্রতিষ্ঠানের অবসায়নে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য টাকার প্রয়োজন হবে। কত টাকা দেওয়া হবে, সেটাও চূড়ান্ত হয়নি। একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় আছে।’

অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত : বিনিয়োগকারীদের বাদ রেখে কেবল আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরোধিত করেছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটস (বিএএসএম) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। যারা বোর্ডে ছিলেন, অর্থ লোপাট করেছেন, তাদের না ধরে, শাস্তির ব্যবস্থা না করে ৭০ শতাংশ শেয়ারধারীর শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। এতে কোনো দিনই আস্থা ফিরবে না। অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি নিরাপরাধ শেয়ারধারীদের অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।’

ক্ষতিপূরণের দাবি বিনিয়োগকারীদের : তালিকাভুক্ত আটটি এনবিএফআই অবসায়ন বা বন্ধ করার প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সোমবার দুপুর ১২টার দিকে পরিষদের সভাপতি কাজী মো. নজরুল ও সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুল হক স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে অবসায়ন প্রক্রিয়া বন্ধের পাশাপাশি একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দাবি জানানো হয়।

নীরব দর্শক বিএসইসি : বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকের পর এবার ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করতে যাচ্ছে, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষার বিষয় কোনোভাবেই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এমন সিদ্ধান্তের পরও নীরব ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

এ বিষয়ে বিএসইসি’র পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘কোম্পানিগুলো অবসায়নে গেলে বিএসইসি বাধা দিতে পারবে না। অবসায়নের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা এলে কমিশন ভেবে দেখবে কী করণীয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিএসইসির অনুরোধ থাকবে, আমানতকারীদের জন্য সরকারের অর্থ বরাদ্দ থাকলে যেন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থটাও দেখা হয়।’

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

শেয়ারবাজার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর