Logo

অর্থনীতি

নিরাপদ ভবন নির্মাণে করণীয়

Icon

বাংলাদেশের প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:১১

নিরাপদ ভবন নির্মাণে করণীয়

ছুটির দিনের সকালে রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের একটি সাততলা আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডে ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোন-৩ এর উপসহকারী পরিচালক মো. আবদুল মান্নান বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে। আগুন দ্বিতীয় তলায় লেগে তা তিনতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। কোনও আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে আগুন লাগার পর ঘুরে ফিরে প্রায়ই একটা বিষয় আলোচনায় আসে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। 

এদিকে সম্প্রতি‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড: নিরাপদ ভবন নির্মাণে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আলো কার্যালয়ে। সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন বলেন, নিরাপদ ভবন নির্মাণকে আমি সব সময় একটি টিমওয়ার্কের সঙ্গে তুলনা করি। ভবনের নিরাপত্তা কোনো একক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল নয়। কেবল উন্নতমানের কেব্ল, সুইচ বা সার্কিট ব্যবহার করলেই হবে না; যিনি এগুলো স্থাপন করবেন, তার দতা, প্রশিণ ও অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলেই বিপদ সেখান দিয়েই আসে।

ভবন নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যারা যুক্ত-স্থপতি, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, কারিগর ও ভবনমালিক; সবারই দায়িত্ব আইন ও বিধিমালা মেনে কাজ করা। বিএনবিসিসহ প্রচলিত নীতিমালা মানলে ভবন নিরাপদ রাখা সম্ভব। ভবন তৈরির সময় আমার মাথায় রাখতে হবে, এটি যেন ভবিষ্যতে আমার সন্তানদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়।

ভূমিকম্প হলে তার দ্বিতীয় প্রভাব হিসেবে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। অথচ আমাদের দেশে ভূমিকম্প ছাড়াই ভবন ধসে পড়ার নজির আছে-রানা প্লাজা বা তেজগাঁওয়ের ফিনিক্স ভবনের মতো। তাই ভবনের নিরাপত্তা বলতে আমি সামগ্রিক নিরাপত্তাকেই বুঝি-কাঠামোগত শক্তি, অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সব একসঙ্গে। বৈদ্যুতিক গোলযোগকে শুধু ‘শর্টসার্কিট’ বলে দায় সারা যাবে না। আর্থিং, গ্রাউন্ডিংসহ নানা কারিগরি বিষয়ের সমন্বয়েই ঝুঁকি তৈরি হয়। নিরাপদ ভবনের জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যান অত্যন্ত জরুরি। সাবস্টেশন কোথায় হবে, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার ও সুইচগিয়ারের মধ্যে কীভাবে সেপারেশন থাকবে-সবকিছু পরিকল্পনায় নির্ধারিত থাকতে হবে। এসব প্যাসিভ ফায়ার সেফটি-ব্যবস্থার মাধ্যমে আগুন প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি ভেন্টিলেশন ও স্বয়ংক্রিয় সাপ্রেশন সিস্টেম থাকতে হবে, যাতে আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে।

গোলটেবিল বৈঠকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বৈদ্যুতিক) মো. নাজমুস সাকিব জামালী বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে আমাদের বড় দুর্বলতা হচ্ছে সচেতনতার অভাব। এমনকি ভবনের লোড ও নিরাপত্তা বিবেচনা না করে অনেক সময় আন্ডার সাইজের কেব্ল ব্যবহার করা হচ্ছে। শর্টসার্কিট হলে সৃষ্ট কারেন্ট নিরাপদে গ্রাউন্ডে পৌঁছানোর জন্য ন্যূনতম কোন সাইজের কেব্ল দরকার, এসব বিষয়ে আলোচনা ও বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারে নকল কেব্ল, সার্কিট ব্রেকার ও নিম্নমানের মাল্টিপ্লাগ।

তিনি বলেন, একটি শিশু বহুতল ভবনে লিফটে আটকে গেলে কী করবে, সে প্রশিক্ষণও জরুরি। অনেক ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রয়েছে, যা ব্যবহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ছাড়া ভবনে স্ট্যান্ড পাইপ সিস্টেম বা ফায়ার হাইড্রেন্ট সিস্টেম আছে, যা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয় না, এমনকি বাসিন্দারাও জানেন না এসব ব্যবস্থা ভবনে রয়েছে। আমরা ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে টাইলস, ফিটিংস বা ফিনিশিং নিয়ে ভাবি, কিন্তু ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম সচল আছে কি না, সেটির জন্য ভবনে আলাদা বিনিয়োগ করার মানসিকতা এখনো সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। বাসাবাড়ির ভেতরেও ঝুঁকি ছড়িয়ে আছে; জেনারেটর, আইপিএস, ব্যাটারি, গিজার, এসি, ফ্রিজ-সবকিছুরই নিয়মিত মেইনটেন্যান্স দরকার। যতটুকু সম্ভব এক্সটেনশন কর্ড বা মাল্টিপ্লাগের ব্যবহার পরিহার করা উচিত। এসব ক্ষেত্রে অবহেলা থেকেই বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ভবনের নকশা প্রণয়নেও সমস্যা আছে। বিএনবিসি অনুযায়ী সাবস্টেশন বা জেনারেটরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে গেলে অনেক সময় তা ভবন ব্যবহারকারীদের চাপে সঠিকভাবে রাখা হয় না। ফলে সিঁড়ির নিচে মিটার রুম বা পাম্প মোটর বসানো হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের কেয়ারটেকার, গার্ড, গৃহকর্মী যাঁরা অফিস চলাকালে বাসায় অবস্থান করেন, তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি প্রশিক্ষণ দরকার। শুধু নকশা নয়, যথাযথ প্রকৌশলীর মাধ্যমে তদারকি, ইলেকট্রিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ ও ভবনমালিকদের সচেতনতা-সবকিছু মিলিয়েই বৈদ্যুতিকভাবে নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

নির্মাণ কথা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর