গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
পুঁজিবাজারে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের শেয়ারদর ও আর্থিক সূচকের সা¤প্রতিক চিত্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মুনাফা কমার প্রবণতা, তুলনামূলকভাবে কম সম্পদমূল্য (এনএভি), উচ্চ স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং অস্বাভাবিক উচ্চ প্রাইস-আর্নিং (পিই) অনুপাত সব মিলিয়ে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থান নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলমান কার্যক্রম থেকে কোম্পানির আয় (ইপিএস) ধারাবাহিকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও সর্বশেষ বছরে তা কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ইপিএস ছিল ২.০৮ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ১.৭২ টাকায়। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১৭ শতাংশ আয় হ্রাস পেয়েছে। সাধারণত আয় কমলে শেয়ারদরেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু এখানে ঘটেছে উল্টোচিত্র।
গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ টাকায়। ফলে ট্রেইলিং পিই অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২০০ গুণের বেশি।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বাজারে ৩০-৪০ গুণ পিই-ই অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ বলে বিবেচিত হয়। সেখানে ২০০ গুণ অনুপাত বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পষ্ট ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো কোম্পানিটির নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি)। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি এনএভি মাত্র ১৬.০২ টাকা। অর্থাৎ বাজারদর বুক ভ্যালুর প্রায় ২৩ গুণ। সাধারণত দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী বা বহুজাতিক শক্ত ভিত্তির কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন ব্যবধান দেখা গেলেও ওরিয়ন ইনফিশনের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র তেমন শক্তিশালী নয়।
ঋণ কাঠামোর দিক থেকেও রয়েছে অসামঞ্জস্য। কোম্পানির স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৩০৫.৭৪ মিলিয়ন টাকা, যেখানে রিজার্ভ ও উদ্বৃত্ত মাত্র ১২২.৫০ মিলিয়ন টাকা। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ না থাকলেও স্বল্পমেয়াদি দায়ের এই উচ্চমাত্রা ভবিষ্যতে নগদ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মুনাফা কমার প্রেক্ষাপটে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ওঠানামা। ২০২৫ সালে কোম্পানি ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে, যদিও একই বছরে আয় কমেছে। অতীতে ১০, ১২ ও ২০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। আয় কমলেও উচ্চ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা টেকসই-তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রায় ৪০.৬১ শতাংশ শেয়ার স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশের বেশি শেয়ার। বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফ্রি-ফ্লোট থাকায় দামের ওঠানামা তীব্র হওয়ার সুযোগও তৈরি হয় বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের আর্থিক চিত্রে এক ধরনের বৈপরীত্য স্পষ্ট- মুনাফা ও সম্পদভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল, কিন্তু শেয়ারদর অত্যন্ত উচ্চ। উচ্চ পিই, কম এনএভি, বেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং আয় হ্রাস- এই চারটি সূচক একসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, শেয়ারদরের উল্লম্ফন সবসময় কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক শক্তির প্রতিফলন নয়। তাই বিনিয়োগের আগে আর্থিক বিবরণী গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এ ব্যাপারে জানতে ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি নাজনীন নাহার রাখির মুঠোফোনে কল করা হয়। তবে তাতে তিনি সাড়া দেননি। পরে এসএমএস পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিকেপি/এমএইচএস

