Logo

অর্থনীতি

বৈশাখ আর দ্রব্যমূল্যের ‘গরমে’ ক্রেতার নাভিশ্বাস

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৯

বৈশাখ আর দ্রব্যমূল্যের ‘গরমে’ ক্রেতার নাভিশ্বাস

বৈশাখের প্রচণ্ড তাপদাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন রাজধানীর কাঁচাবাজারে যেন নতুন করে আগুন লেগেছে। শীতকালীন সবজির বিদায় আর গ্রীষ্মকালীন সবজির আগমনে বাজার স্বস্তি ফেরার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্র উল্টো। অধিকাংশ সবজিই এখন সেঞ্চুরি’ হাঁকিয়েছে। এর সঙ্গে নতুন যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত পরিবহন খরচ। ফলে চাল, ডাল, চিনি ও পেঁয়াজের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি তৈরি করেছে ভোজ্যতেল। সরকারি আশ্বাস সত্ত্বেও বাজার থেকে অনেকটা উধাও’ হয়ে গেছে ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত কয়েক দিনে একাধিকবার বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজার, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ১ লিটারের বোতলজাত তেল ১৯৫ টাকায় কিছু দোকানে মিললেও ৫ লিটারের বোতলজাত তেলের দেখা নেই কোথাও।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, এটি সরাসরি কোম্পানিগুলোর কারসাজি’। হাতিরপুল বাজারের তাহের স্টোরের আবু তাহের বলেন, কোম্পানির প্রতিনিধিরা ৫ লিটারের তেল দিচ্ছে না। তারা বলছে সরবরাহ কম, কিন্তু আমরা জানি দাম বাড়ানোর ধান্দায় তারা সিন্ডিকেট করছে। ৫ লিটারের তেল না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা তেল কিনছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ক্ষতিকর, দামেও পড়ছে বেশি।” ক্রেতারা অভিযোগ করছেন, ১ লিটারের বোতলে খরচ বেশি পড়ে বলে ৫ লিটারের বোতলে তাদের কিছুটা সাশ্রয় হতো, কিন্তু বাজার থেকে তা পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

রমজান মাস শেষ হওয়ার পর সবজির দাম কিছুটা কমার কথা থাকলেও বৈশাখের তাপদাহে তা আরও বেড়েছে। রাজধানীর বাজারে অধিকাংশ সবজি এখন ১০০ টাকার উপরে। বাজারে আগাম আসা কাঁকরোল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং পটোল ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঢ্যাঁড়স ৭০-৮০ টাকা, ঝিঙা ও চিচিঙা ১০০ টাকা এবং শজনেডাঁটা ১২০-১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সবজি বিক্রেতা মো. জসিম জানান, আড়তে মাল কম আসছে। প্রচণ্ড গরমে অনেক সবজি পচে যাচ্ছে এবং পরিবহনের সময় নষ্ট হচ্ছে। ট্রাকভাড়া বাড়ার কারণে প্রতি কেজিতে খরচ ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে।” অন্যদিকে ক্রেতাদের ক্ষোভের সীমা নেই। শাহজাহান রোডের বাসিন্দা মো. তাজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাধারণ কাঁচা পেঁপের কেজি ৬০ টাকা হলে গরিব মানুষ খাবে কী? বাজারের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।”

সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। গত সপ্তাহে ১১০ টাকা ডজন বিক্রি হওয়া ফার্মের মুরগির ডিম ২০ টাকা বেড়ে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় ঠেকেছে। পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে কোথাও কোথাও হালি ৫০ টাকা বা ডজন ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, প্রচণ্ড গরমে খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে এবং ডিমের উৎপাদন কমেছে, তাই সরবরাহ সংকটে দাম বেড়েছে। ভরা মৌসুমেও পেঁয়াজের দাম বাড়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। পাবনা ও রাজশাহীর ভালো মানের পেঁয়াজ গত সপ্তাহের চেয়ে কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আড়তদাররা বলছেন, ফলন ভালো হলেও মজুদদাররা পেঁয়াজ ছাড়ছে না। তবে ফরিদপুরের পেঁয়াজ কিছুটা কমে ৪৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। রাজধানীর বাজারে মাঝারি মানের চালের (বিআর-২৮ ও পায়জাম) দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এই চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সরু চাল বা মিনিকেটের দাম ৭০ থেকে ৮৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খিলগাঁও তালতলা বাজারের চাল বিক্রেতা এনামুল বলেন, বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে, আমনের চালও মজুত আছে। কিন্তু ট্রাকভাড়া আড়াই হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় চালের দাম এক-দুই টাকা বেড়েছে।” অন্যদিকে, চিনির দামও কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়েছে। প্যাকেটজাত চিনির সংকট দেখা দেওয়ায় খোলা চিনি ১১০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

অস্থির এই বাজারের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির খবর দিচ্ছে সোনালি মুরগি। আগে ৪১০ টাকা পর্যন্ত উঠলেও বর্তমানে সোনালি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকার ঘরে স্থির রয়েছে। তবে মুরগির ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই দামও তেলের দাম বাড়ার কারণে স্থিতিশীল হতে পারছে না। বিপরীতে মাছের বাজারে আগুন। প্রকারভেদে সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ২২০ টাকার নিচে কোনো মাছই পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝারি ও বড় সাইজের রুই মাছ ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নদীর মাছ যেমন ট্যাংরা বা কাজলি মাছ ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার দামও গত সপ্তাহের তুলনায় ২০-৩০ টাকা বেড়েছে।

প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে চালক ও পাইকারি বিক্রেতারা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। সরকার ডিজেলের কারণে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১১ পয়সা বাড়ালেও পণ্যবাহী ট্রাকগুলো ট্রিপ প্রতি ২ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। এর ফলে সবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের খুচরা মূল্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-র দৈনিক বাজার দরেও অনেক পণ্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। টিসিবি জানায়, সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেল, চিনি, চাল, ডিম ও শসার দাম ঊর্ধ্বমুখী। রমজানে যে সবজির দাম চড়া ছিল, তা কমার বদলে স্থিতিশীল বা আরও চড়া হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু সরবরাহ সংকট বা জ্বালানি তেলের দাম নয়, বরং বাজার মনিটরিংয়ের অভাব এবং সিন্ডিকেটের সক্রিয়তা এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মতে, "ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে পেঁয়াজ-চিনি পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। ৫ লিটারের তেল বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া একটি পরিকল্পিত অপরাধ। নিয়মিত অভিযান না চালালে এই সংকটের সমাধান হবে না।"

বৈশাখের খরতাপের মতো বাজারের উত্তাপও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ৫ লিটারের তেলের আকাল, ডিমের দাম বৃদ্ধি এবং সবজির সেঞ্চুরি’র ঘরে অবস্থান—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য এই বৈশাখ অত্যন্ত কঠিন বার্তা নিয়ে এসেছে। সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং কঠোর বাজার মনিটরিং ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন