Logo

অর্থনীতি

বিকেএমইএ সভাপতি

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে দিনে ২ ঘণ্টা কারখানা বন্ধ থাকছে

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১:০১

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে দিনে ২ ঘণ্টা কারখানা বন্ধ থাকছে

দেশে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নিটওয়্যার খাতের কারখানাগুলোতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুই ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় এই লোডশেডিংয়ের মাত্রা ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে, যা রপ্তানি আয়ের প্রধান এই খাতের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বিটিকেজি এক্সপো ২০২৬’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগের কথা জানান বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বিকেএমইএ সভাপতি জানান, বর্তমানে জ্বালানি সংকট এতটাই ঘনীভূত হয়েছে যে কারখানা চালানো দুরুহ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ভালুকা ও রাজেন্দ্রপুরের মতো শিল্পাঞ্চলগুলো পল্লি বিদ্যুতের (আরইবি) আওতায় হওয়ায় সেখানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। কোথাও কোথাও ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে আমরা যে জেনারেটর চালাব, তারও উপায় নেই। কারণ ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) একটি অদ্ভুত নির্দেশনার কারণে ড্রামে করে তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে। মোহাম্মদ হাতেম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কারখানার বিশাল জেনারেটর তো আর গাড়ি নয় যে ঠেলে ফিলিং স্টেশনে নিয়ে যাব। ড্রামে তেল না পাওয়ায় গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অনেক কারখানা এখন পুরোপুরি বন্ধ রাখার উপক্রম হয়েছে। আমরা বিপিসির সাথে কথা বলেছি, কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।”

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত এক বছরে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং বর্তমান জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্যের সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেড়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিদেশি ক্রেতা ও সংস্থাগুলো সবসময় তদারকি করে আমরা শ্রম আইন মানছি কি না। কিন্তু আমরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি কি না, সেদিকে তাদের কোনো নজর নেই। বিশ্ববাজারে বর্তমানে চাহিদা কমে যাওয়ায় আমাদের ক্রয়াদেশও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এই দ্বিমুখী চাপে উদ্যোক্তারা এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছেন।”

জ্বালানি সংকট কাটাতে অনেক উদ্যোক্তা সোলার সিস্টেম বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে চাইলেও সেখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর কাঠামো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, আমরা নিজস্ব উদ্যোগে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে চাইছি, কিন্তু সোলার সরঞ্জাম আমদানিতে এনবিআর উচ্চহারে কর আরোপ করে রেখেছে। সংকটের সময়ে সরকারের উচিত ছিল এসব ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তা দেওয়া, কিন্তু আমরা উল্টো বাধার সম্মুখীন হচ্ছি।”

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, শুধু জ্বালানি নয়, প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও তারা কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। মোহাম্মদ হাতেম জানান, শিপমেন্টে সামান্য দেরি হলে ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে অসহযোগিতা করছে। এছাড়া কাস্টমসে পণ্যের এইচএস কোড নিয়ে হয়রানি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, আইনত পণ্যের কোড থাকা বাধ্যতামূলক না হলেও কাস্টমস কর্মকর্তারা এটি নিয়ে জটিলতা তৈরি করছেন, যা রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।”

তবে এত সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন বিকেএমইএ-র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেশী পাকিস্তান বা অন্য অনেক দেশে জ্বালানির দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সরকার দাম নিয়ন্ত্রণে রাখায় আমাদের উৎপাদন ব্যয় এখনো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে আছে। তবে বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অর্ডার কমে যাওয়াটাই এখন আমাদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ।”

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে পোশাক খাতের এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে। একইসাথে সোলার ও গ্রিন এনার্জির ওপর আমদানিশুল্ক কমিয়ে দ্রুত বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন