Logo

অর্থনীতি

'শ্যাডো ইকোনমি'র সরিয়ে এশিয়ার নতুন মডেল উজবেকিস্তান

Icon

বিজনেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১:০৬

'শ্যাডো ইকোনমি'র সরিয়ে এশিয়ার নতুন মডেল উজবেকিস্তান

মধ্য এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি উজবেকিস্তান তাদের জাতীয় অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে এক উচ্চাভিলাষী ডিজিটাল মিশনে নেমেছে। দেশটির সরকারের লক্ষ্য স্পষ্ট—প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ছায়া অর্থনীতি বা 'শ্যাডো ইকোনমি'র অন্ধকার সরিয়ে একটি স্বচ্ছ, ডিজিটাল এবং কর-বান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। দীর্ঘকাল ধরে সোভিয়েত আমলের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের যে সংস্কৃতি উজবেকিস্তানে শিকড় গেড়েছিল, তাকে উপড়ে ফেলতে প্রেসিডেন্ট শভকাত মির্জিইয়োয়েভ এখন ফিনটেক এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

উজবেকিস্তানের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশটির জিডিপির প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই এখনো অনানুষ্ঠানিক বা ছায়া অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ হলো, দেশের অর্ধেক লেনদেনই রাষ্ট্রীয় হিসাব বা কর জালের বাইরে থেকে যায়। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায় এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। ২০২৬ সালের এই পর্যায়ে এসে উজবেকিস্তান সরকার ঘোষণা করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা এই ছায়া অর্থনীতির হার ১৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনবে।

উজবেকিস্তানের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার হলো ক্যাশলেস পেমেন্ট বা নগদবিহীন লেনদেন। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ডিজিটাল উজবেকিস্তান-২০৩০’ কৌশল বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় দেশটির প্রতিটি ছোট-বড় দোকানে কিউআর কোড পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমানে উজবেকিস্তানে হুমো’ এবং ইউজকার্ড’ নামক দুটি পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কেনাকাটা করছে। ডিজিটাল লেনদেনে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে সরকার অভিনব পদ্ধতি চালু করেছে। কোনো গ্রাহক যদি কার্ড বা কিউআর কোড দিয়ে পেমেন্ট করেন এবং সেই রসিদ সরকারি অ্যাপে স্ক্যান করেন, তবে তিনি ১ শতাংশ সরাসরি ক্যাশব্যাক পান। এই পদ্ধতিটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্টের জনপ্রিয়তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ছায়া অর্থনীতি বড় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুস বা অনানুষ্ঠানিক লেনদেন। উজবেকিস্তান এখন তাদের অধিকাংশ সরকারি সেবা ওয়ান-স্টপ’ ডিজিটাল পেমেন্ট পোর্টালের আওতায় নিয়ে এসেছে। ব্যবসা নিবন্ধন থেকে শুরু করে ড্রাইভিং লাইসেন্স বা পাসপোর্ট ফি—সবই এখন অনলাইনে পরিশোধ করতে হয়। এর ফলে মানুষের সাথে সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি সাক্ষাৎ কমেছে, যা দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

উজবেকিস্তান নিজেকে একটি ক্রিপ্টো ফ্রেন্ডলি’ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। তবে এটি অনিয়ন্ত্রিত নয়। ২০২৬ সালের মধ্যে দেশটি ডিজিটাল সম্পদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। সরকারের ন্যাশনাল এজেন্সি অফ প্রস্পেকটিভ প্রজেক্টস ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোকে লাইসেন্স দিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে রিয়েল এস্টেট এবং সাপ্লাই চেইন ট্র্যাকিং নিশ্চিত করা, যাতে অবৈধ লেনদেন শনাক্ত করা সহজ হয়।

উজবেকিস্তানের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে রাশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত এবং ডিজিটাল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে টিবিসি ব্যাংক’ -এর মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ব্যাংকগুলো প্রবেশ করেছে। এই ব্যাংকগুলো কোনো শারীরিক শাখা ছাড়াই সম্পূর্ণ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে এবং আমানত গ্রহণ করছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসছে, যা আগে সম্ভব ছিল না।

২০২৬ সালে উজবেকিস্তানের আইটি রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করার পথে রয়েছে। তাসখন্দে স্থাপিত আইটি পার্ক’ বর্তমানে হাজার হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সরকার এই আইটি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য করমুক্ত সুবিধা ঘোষণা করেছে। ফলে রাশিয়ার অনেক প্রযুক্তিবিদ এবং কোম্পানি এখন তাসখন্দকে তাদের নতুন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে এবং ডিজিটাল লিটারেসি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে মধ্য এশিয়ার এই দেশটি বর্তমানে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো এবং চীন উভয়েই উজবেকিস্তানে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক সম্প্রতি উজবেকিস্তানের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে ৫শ মিলিয়ন ডলারের একটি নতুন ঋণ অনুমোদন করেছে। এই অর্থ দিয়ে দেশের ৫জি নেটওয়ার্ক এবং সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা উন্নত করা হবে।

সবকিছু ইতিবাচক মনে হলেও উজবেকিস্তানের এই পথে কিছু কাঁটা রয়ে গেছে। প্রথমত, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে জড়তা। দ্বিতীয়ত, দেশের সব অঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের অভাব। এছাড়া ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সাথে সাথে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে, যা মোকাবিলা করা তাসখন্দের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

উজবেকিস্তানের এই ডিজিটাল যাত্রা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং এটি একটি জাতির মানসিকতা পরিবর্তনের সংগ্রাম। ছায়া অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তোলার যে সাহস উজবেকিস্তান দেখাচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় শিক্ষা হতে পারে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কীভাবে একটি দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠছে আজকের উজবেকিস্তান।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন