Logo

অর্থনীতি

বিদ্যুতের দাম বাড়াল সরকার

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১৫:৩৮

বিদ্যুতের দাম বাড়াল সরকার

# চলতি জুন থেকেই কার্যকর

# খুচরা পর্যায়ে বেড়েছে ১৬.৬৮ শতাংশ

# পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ বেড়েছে

# ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়

# বাজেট মাথায় রেখেই দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি: বিইআরসি চেয়ারম্যান

# নতুন মূল্য নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ

দেশে আবারও বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। অনেকটা তাড়াহুড়া করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাড়ানো হলো। এতে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন এ দাম চলতি জুন থেকেই কার্যকর হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমাতে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের এই মূল্য সমন্বয় করেছে বিইআরসি।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং খুচরা পর্যায়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা বা কোম্পানিসমূহের বিভিন্ন গ্রাহক শ্রেণির বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

বুধবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এ ঘোষণা দেন। কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, জুন মাসের বিল থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।

ঘোষণা অনুযায়ী, খুচরা বিদ্যুৎ মূল্যহার (ভারিত গড়) প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় সমন্বয় করা হয়েছে। অপরদিকে সমন্বয় হিসেবে পাইকারি মূল্যহার (ভারিত গড়) প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আবেদন, দাখিলকৃত দলিলাদি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত পর্যালোচনার পর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ অনুযায়ী পাইকারি, সঞ্চালন এবং খুচরা মূল্যহার পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিবিপিএলসি)-এর সঞ্চালন ব্যয় বিবেচনায় বিদ্যুতের বিদ্যমান সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ (ভারিত গড়) প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ০.৩১৩৫ টাকা থেকে ০.০৭৫১ টাকা বাড়িয়ে ০.৩৮৮৬ টাকায় সমন্বয় করা হয়েছে।

নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহকদের (মাসিক ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী) জন্য ইউনিট প্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ৬৯ পয়সা বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সায় সমন্বয় করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়েছে, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫১ পয়সা বাড়িয়ে ৯ টাকা ১০ পয়সা। ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৮ টাকা ২ পয়সা থেকে ১ টাকা ৬০ পয়সা বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সা। ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ২ টাকা ৩৪ পয়সা বাড়িয়ে ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের ওপরে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে ২ টাকা টাকা ৭৪ পয়সা বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সায় সমন্বয় করা হয়েছে।

এদিকে, কৃষি সেচে ইউনিট প্রতি ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছে। শিক্ষা, ধর্মীয়, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের ক্ষেত্রে ৯ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা করা হয়েছে। ক্ষুদ্রশিল্পের ক্ষেত্রে ১১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করা হয়েছে। নির্মাণশিল্পে ১৫ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা ৯ পয়সায় সমন্বয় করা হয়েছে। ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও ব্যাটারিচার্জিং স্টেশনে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ও অফিসে ১৩ টাকা ১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সায় সমন্বয় করা হয়েছে।

তাড়াহুড়া করে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, কোনো চাপ ছিল না। বাজেট মাথায় রেখে দ্রুত করা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের ব্যয় বাড়বে, তবে অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা করার সুযোগ আছে।

সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছুটা কমে সরকার নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয়, তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না। তারা খুচরা দামে ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে কোম্পানি চালায়।

বিইআরসির আদেশ বলছে, পাইকারিতে বর্তমান দাম ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে গড় দাম ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। আর খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। অন্যদিকে সঞ্চালন খরচ (গড়) ইউনিট প্রতি ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ পয়সা করা হয়েছে।

বিদ্যুতের একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি), প্রতি ইউনিটে যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ও ৪৯ পয়সা করার আবেদন করেছিল।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ইউনিট প্রতি ১ দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১ দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) দাম বাড়ানোর আবেদন করে। মূল্যবৃদ্ধির আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২ দশমিক ৯১ টাকার মতো। গত ২০ ও ২১ মে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কমিশন সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, মিজানুর রহমান, সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার।

নতুন মূল্য নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ: বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রাজধানীর মালিবাগের বাসিন্দা কবীর হোসেন বলেন, ‘সব কিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হলে সেটি বুঝি, কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যয় বেড়ে থাকলে তার দায়ও কি সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে?’

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প উৎপাদন ব্যয়, সেচ কার্যক্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা ভোক্তাদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিল কেবল এনার্জি চার্জের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মিটার ভাড়াও যুক্ত হয়। ফলে নতুন দামে কেবল ইউনিট মূল্য বৃদ্ধি নয়, মোট বিলেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, অধিকাংশ গ্রাহককে আগের তুলনায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বেশি বিল পরিশোধ করতে হতে পারে।

ফলে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপরও নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেসব পরিবার সীমিত আয়ের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামাল দেয়, তাদের জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ বিল নতুন উদ্বেগ হয়ে দেখা দিলো— যা আবার চলতি জুন থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১২ দশমিক ৯১ টাকার মতো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) তাদের সঞ্চালন খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও কমিশন সব দিক বিবেচনা করে এই দর নির্ধারণ করেছে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন