ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হতে যাচ্ছে আজ মঙ্গলবার। গতকাল অর্থবিল পাসের মাধ্যমে কর ও শুল্কসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। আজ স্পিকার বাজেটের ওপর কণ্ঠভোট গ্রহণ করে তা পাস করবেন, যা আগামীকাল ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। সব পক্ষের প্রস্তাব ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে বাজেট চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বড় বাজেটে খুব যে বেশি পরিবর্তন আসছে তা নয়, পরিবর্তনগুলো ছোট ছোট। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এবারের বাজেট হবে সুন্দর, স্বাভাবিক ও বাস্তবমুখী এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি আনবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রস্তাবিত এ বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব’ বাজেট আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এবারই প্রথম বাজেট ঘোষণার পর কোনো নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি।
সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে প্রস্তাবিত বাজেটে কর-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বাজেটের মূল কাঠামো, আকার কিংবা সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অপরিবর্তিতই থাকছে।
ওই সিদ্ধান্তের আলোকে গতকাল জাতীয় সংসদে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়াসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্ককর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে ওনাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।
গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট আলোচনার সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর-ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও করদাতাবান্ধব করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৫ লাখ টাকা করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে এই সীমা যথাক্রমে ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ৪ লাখ ও সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরির বিষয়টি নজরে আসার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ার কারণে করদাতাদের হয়রানি কমাতেই এ বিধান আনা হয়েছিল। তবে অনেকেই এটিকে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাই প্রস্তাবিত এই বিধান প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
করের আওতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবেও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে এ প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান সরকার প্রধান।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বর্তমানে আরোপিত ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। তবে শর্ত হিসেবে তিনি বলেন, কর-সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন করতে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।
গতকাল সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং হয়রানি বন্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকবে।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। তথ্য বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হতে যাচ্ছে। আর এই বিশাল বাজেটের বাড়তি ব্যয় মেটাতে বড় ভরসা রাখা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের ওপর। আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ৮০ শতাংশ আদায়ের মূল দায়িত্ব থাকবে এনবিআরের কাঁধে। নতুন বাজেটে প্রতিষ্ঠানটির জন্য একক লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বছরগুলোতে এনবিআরের গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কখনই ১৫-১৬ শতাংশের বেশি অতিক্রম করতে পারেনি। সেখানে আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা সম্পূর্ণ রূপকথা তুল্য। বিগত ২৫ বছরের (২০০১-২০২৫) ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এনবিআর কেবল একবারই ২০১১ সালে সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছিল।
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন অর্থবছরে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করা হবে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও জনস্বস্তিকে প্রাধান্য দিয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। এছাড়া মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

