Logo

অর্থনীতি

সতর্ক করল এনবিআর

অডিটের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৬:১০

অডিটের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নাম ভাঙিয়ে অডিটের ভয় দেখিয়ে করদাতাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এনবিআর ভবনের আশপাশে সক্রিয় একটি দালালচক্র করদাতাদের টিআইএন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য ও অডিটসংক্রান্ত নানা অজুহাত ব্যবহার করে অর্থ (ঘুষ) দাবি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

কেউ কেউ নিজেদের কর কর্মকর্তা, অফিস সহকারী, আইনজীবী বা ‘উচ্চপর্যায়ের পরিচিত ব্যক্তি’ পরিচয় দিয়ে করদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

অভিযোগ রয়েছে, অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে করদাতাদের ফোন করে বলা হচ্ছে তাদের আয়কর নথি অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়েছে, পুরোনো রিটার্নে অসংগতি ধরা পড়েছে অথবা বড় অঙ্কের জরিমানা হতে পারে। পরে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে বিষয়টি ‘সমাধান’ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কেউ টাকা দিতে রাজি না হলে ফাইল আটকে দেওয়া, হয়রানি করা কিংবা বড় অঙ্কের কর নির্ধারণের ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন করদাতা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক করদাতা বাংলাদেশের খবরের প্রতিবেদককে বলেন, অডিটের নোটিশ আসার আগেই আমরা ফোন পেয়ে যাই। ফোনদাতারা এমন কিছু তথ্য বলেন, যা সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়। 

রাজধানীর কাপ্তান বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শহীদ হাসান ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আমাকে গত দুদিন ধরে মোবাইল করা হচ্ছে। আমার টিআইএন, মোবাইল নম্বর, ব্যবসার ধরন, রিটার্নের তথ্য কিংবা অডিটসংক্রান্ত সম্ভাব্য তথ্য কারা বাইরে দিচ্ছে? নাকি কোনো চক্র ভুয়া তথ্য দিয়ে ভয় তৈরি করে আমার কাছ থেকে টাকা চাইছে? 

এদিকে জানতে চাইলে করসংশ্লিষ্ট একজন বলেন, অডিট একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আয়কর রিটার্ন, আয়-ব্যয়ের হিসাব, কর পরিশোধ ও নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য করদাতার ফাইল অডিটে যেতে পারে। কিন্তু অডিটের নামে ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো কর কর্মকর্তা বা কর্মচারী ব্যক্তিগত নম্বর থেকে ফোন করে করদাতার কাছে টাকা দাবি করতে পারেন না। করসংক্রান্ত নোটিশ ও নির্দেশনা নির্ধারিত অফিসিয়াল পদ্ধতিতেই দেওয়ার কথা।

গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, এনবিআর ভবনের আশপাশে করসেবা দেওয়ার নামে দালালদের অবাধ বিচরণ। ভবনের বাইরে ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কিছু ব্যক্তি করদাতাদের ঘিরে ধরে দ্রুত রিটার্ন জমা, ফাইল ছাড়ানো, অডিট বন্ধ, জরিমানা কমানো, আপিল করানো কিংবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘যোগাযোগ’ করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছেন। 

গতকাল সকালে ভবনের নিচে দাঁড়ানো ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী মাসুদা বেগম বলেন, অনেক সময় নতুন করদাতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং কর আইনের জটিলতা না বোঝা মানুষ এসব চক্রের ফাঁদে পড়েন। অফিস ভবনের বাইরে নয়, করদাতারা যদি একটু কষ্ট করে কর অফিসের ভেতরে গেলে এবং সংশ্লিষ্ট সেকশনে যোগাযোগ করলেই সমস্যার সমাধান মিলবে। 

রাজধানী সুপার মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মিজান রহমান বলেন, ‘এক ব্যক্তি আমাকে ফোন করে বলেন, আমার ফাইল অডিটে গেছে। তিনি বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কয়েক লাখ টাকা জরিমানা হবে। পরে তিনি একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। সন্দেহ হওয়ায় আমি টাকা দিইনি। কিন্তু কয়েক দিন আতঙ্কে ছিলাম।’

আরেক করদাতা কলাবাগানের আশিক শাহরিয়ার বলেন, ‘ফোনদাতা আমার প্রতিষ্ঠানের নাম, টিআইএন এবং আগের বছরের রিটার্নের কিছু তথ্য বলেছিলেন। এতে মনে হয়েছে, তিনি ভেতরের তথ্য জানেন। পরে টাকা না দেওয়ায় তিনি বলেন, অডিট হলে বুঝতে পারব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন কর আইনজীবী বলেন, করদাতার ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সুরক্ষিত রাখা এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনোভাবে এসব তথ্য বাইরে চলে গেলে তা শুধু দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে না, করদাতার আস্থাও নষ্ট করে। এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে তথ্য কোথা থেকে পাচার হচ্ছে বা কারা করদাতাদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।

তারা বলছেন, অডিট নির্বাচন, নোটিশ প্রদান, শুনানি, কর নির্ধারণ ও আপিলের সব প্রক্রিয়া যত বেশি ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ হবে, দালালচক্রের সুযোগ তত কমবে। 

সিনিয়র আইনজীবী পিকে আব্দুর রব মনে করেন, করদাতার জন্য এমন একটি অনলাইন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে তিনি নিজের ফাইলের বর্তমান অবস্থা, অডিটের কারণ, প্রয়োজনীয় নথি, শুনানির সময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অফিসিয়াল পরিচয় যাচাই করতে পারবেন।

এনবিআর ভবন ও কর অঞ্চলগুলোতে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে রাজধানীর সেগুনবাগিচা, পুরানা পল্টন ও নয়া পল্টন রোডে অবস্থিত কর অঞ্চলগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য বেশি দেখা যায়। আশপাশের কম্পিউটার, ফটোকপির দোকানে এদের আনাগোনা বেশি।  

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবনের প্রবেশপথে তথ্যসেবা ডেস্ক, অনুমোদিত কর পরামর্শকের তালিকা, সিসিটিভি নজরদারি, অভিযোগ বক্স এবং তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণের হটলাইন চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অফিস প্রাঙ্গণে অননুমোদিত ব্যক্তির আনাগোনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

করদাতাদের অভিযোগ, ঘুষ দাবির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেলেও অনেকেই সাহস পান না। কারণ তারা আশঙ্কা করেন, অভিযোগ করলে ভবিষ্যতে তাদের ফাইল আরও বেশি জটিলতায় পড়তে পারে। এ কারণে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রেখে তদন্ত, দ্রুত প্রতিকার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু দালাল আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। দালালচক্রের পেছনে কেউ তথ্য দিচ্ছে কি না, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যোগসাজশ আছে কি না এবং মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হচ্ছে কি না এসবও তদন্তে আনতে হবে। প্রয়োজনে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান চালানো যেতে পারে।

করদাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অজ্ঞাত নম্বর থেকে অডিট, জরিমানা বা ফাইল আটকে দেওয়ার কথা বলে টাকা চাইলে কোনো অর্থ লেনদেন করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করে নোটিশের সত্যতা যাচাই করতে হবে। ফোন নম্বর, বার্তা, কল রেকর্ড বা লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোও জরুরি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির এক নেতা গতকাল মোবাইল ফোনে বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে করদাতাকে ভয় দেখিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে এগোতে হবে। অডিটের নামে ঘুষ দাবি এবং এনবিআর ভবনের আশপাশে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। 

এদিকে আয়কর নথি নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতির লোভ দেখিয়ে প্রতারক চক্রের টাকাপয়সা দাবির অভিযোগ বিষয়ে সতর্ক করেছে জাতীয় রাস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এনবিআর বলছে, এনবিআরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী করদাতার কর নথি নিরীক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যক্তিগ মোবাইল ফোন নম্বর বা অননুমোদিত মাধ্যমে যোগাযোগ করেন না। নিরীক্ষার জন্য ফাইল নির্বাচিত হলে তা আইনানুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত নোটিশের মাধ্যমে করদাতাকে জানানো হয়।

গতকাল রোববার সকালে এনবিআর এ বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে করদাতাদের সতর্ক করেছে।

এনবিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করা গেছে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র করদাতাদের কর নথি নিরীক্ষায় পড়ার তথ্য দিয়ে বিভিন্ন ফোন নম্বর থেকে যোগাযোগ করছেন। তারা নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বা আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে করদাতাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ দাবি করছেন এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এ জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখার জন্য করদাতাদের অনুরোধ করেছে এনবিআর। সেগুলো হলোÑ

১. লিখিত নোটিশ ছাড়া কোনো যোগাযোগ নয়: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী করদাতার কর নথি নিরীক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর বা অননুমোদিত মাধ্যমে যোগাযোগ করেন না। নিরীক্ষার জন্য ফাইল নির্বাচিত হলে তা আইনানুযায়ী আনুষ্ঠানিক লিখিত নোটিশের মাধ্যমে করদাতাকে জানানো হয়।

২. আর্থিক লেনদেনে সতর্কতা: করসংক্রান্ত যেকোনো বকেয়া কর বা ফি শুধু সরকারি চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হয়। কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তি করদাতার কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে, বিকাশ, রকেট, নগদ বা অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না।

৩. তথ্য যাচাই করুন: এ ধরনের কোনো সন্দেহজনক ফোন কল, খুদে বার্তা বা ই-মেইল পেলে বিভ্রান্ত না হয়ে অবিলম্বে আপনার সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের উপকর কমিশনারের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করুন।

৪. আইনি ব্যবস্থা: কোনো প্রতারক চক্র যদি এনবিআরের কর্মকর্তা সেজে অর্থ দাবি করেন, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে (পুলিশ) অবহিত করুন এবং প্রতারকের ফোন নম্বরটি সংরক্ষণ করুন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করদাতাদের হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ সেবা প্রদানে বদ্ধপরিকর। কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে কোনো আর্থিক লেনদেন না করার জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন