বীমা কোম্পানির মার্জিন ঋণে বাঁধা
‘পিবি রেশিও’ আতঙ্কে পুঁজিবাজার
এম এম হাসান
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ২১:০৮
ছবি: সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে লেনদেন বাড়ানো এবং তারল্য উন্নত করার লক্ষ্যে মার্জিন ঋণের বিধিমালা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এরই মধ্যে সংশোধিত খসড়া প্রস্তাবনার ওপর দুই সপ্তাহের মধ্যে মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি আহ্বান করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় বিভিন্ন বিষয়ে স্বস্তি মিললেও নতুন করে যুক্ত হওয়া ব্যাংক, বীমা ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) জন্য ‘প্রাইস টু বুক ভ্যালু বা পিবি রেশিও’ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিধানটি বাস্তবায়িত হলে বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই মার্জিন ঋণ সুবিধার বাইরে থেকে যাবে- এমন গুঞ্জন বাজারে ছড়িয়ে পড়ায় সম্প্রতি পুরো পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অবশ্য এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়; এটি রিভিউ (পর্যালোচনা) করা হবে। এতে প্রশ্ন উঠছে যে ‘পিবি রেশিও’ থাকবে নাকি বাতিল হবে?
বিএসইসি নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫ পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এই বিধিমালাটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সময়ে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে সরকারের গেজেটভুক্ত হয়। বর্তমান কমিশন বাজার অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সেরে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বিধিমালাটির সংশোধনী প্রস্তাব (খসড়া) তৈরি করে এতে জনমত আহ্বান করেছে।
প্রস্তাবনায়, কম লভ্যাংশ দেওয়া ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও মার্জিন ঋণ পাওয়ার সুবিধা রাখা হয়। পাশাপাশি ব্রোকারেজ হাউজ ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্জিন ঋণ বিতরণের সীমাও বাড়ানো হয়েছে। আর বিনিয়োগকারীর বেনিফিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবে মাত্র তিন লাখ টাকার সিকিউরিটজ থাকলেই মার্জিন ঋণ পাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সীমা এতদিন পাঁচ লাখ টাকা ছিল। প্রস্তাবিত বিধিমালায় এমন আরও অনেক বিষয়ে স্বস্তি আনা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রাহকের ইকুইটির বিপরীতে মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ অনুপাত সব ক্ষেত্রে এক অনুপাত এক নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে পরিস্থিতিভেদে এটি এক অনুপাত এক, এক অনুপাত শূন্য দশমিক পাঁচ ও এক অনুপাত শূন্য দশমিক ২৫ ছিল। তবে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব নীতিমালার আলোকে চাইলে এক অনুপাত এক এর চেয়ে কম ঋণ দিতে পারবে।
নতুন খসড় প্রস্তাবনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়াতে নিট সম্পদের বিপরীতে অর্থায়নের সীমা তিন গুণ থেকে বাড়িয়ে পাঁচ গুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মূলধন ১০০ টাকা হলে বর্তমানে তারা সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে; নতুন নিয়মে তা বেড়ে ৫০০ টাকা হতে পারে। আর একক কোন কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণের এক্সপোজার সীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। গ্রাহকের ইকুইটি ৭৫ শতাংশের নিচে নামলে আগে মার্জিন কল দেওয়া হলেও এখন তা ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে ফোর্সড সেলের বিধানটি আগের মতো থাকছে অপরিবর্তিত। তা ছাড়া, সিকিউরিটিজে মার্জিন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্য আয় অনুপাত বা ‘পিই রেশিও’ ৩০ এর নিচে নামলে সেটি অযোগ্য বিবেচিত হবে।
এতসব স্বস্তির মধ্যে ‘পিবি রেশিও’ ঠিক বিপরীতমুখী আবস্থানে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বীমা খাতের জন্য প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে যে, এই খাতের কোম্পানিগুলোর ‘পিবি রেশিও’ যদি ১ (এক) এর অধিক হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। অর্থাৎ নির্ধারিত দিনে কোন বীমা কোম্পানির শেয়ারমূল্য যদি সর্বশেষ শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের (এনএভিপিএস) তুলনায় বেশি হয়, তাহলে ওই শেয়ারে মার্জিন সুবিধা পাওয়া যাবে না। এই হিসাবে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বীমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল সাত থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান মার্জিন ঋণের সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে, প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ‘পিবি রেশিও’ ৩ (তিন)-এর অধিক হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। এক্ষেত্রে অবশ্য তেমন কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। কেননা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের বাজারমূল্য শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের কাছাকাছি রয়েছে। ফলে অন্যান্য শর্তে না আটকালে ‘পিবি রেশিও’-এর ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্জিন ঋণ পেতে কোনো ধরনের বাধা হবে না।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার তুলনামূলক ছোট এবং বেশিরভাগ কোম্পানি নিয়মিত ভালো পরিমান লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। এতে বিনিয়োগাকারীদের আগ্রহ থাকায় এই খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের বাজারদর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের (এনএভিপিএস) তুলনায় বেশি রয়েছে। বিপরীতে খেলাপি ও ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের বাজারদর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত বিধিমালা থেকে বীমা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘পিবি রেশিও’ সীমা বাড়ানো অথবা প্রস্তাবটি বাতিল করা সমীচীন হবে।
এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, বিএসইসি যেহেতু এখনো মার্জিন বিধিমালাটি চূড়ান্ত করেনি এবং মতামত আহ্বান করেছে। সেহেতু বিভিন্ন মতের আলোকে যৌক্তিক সমাধানও আসতে পারে। তবে, আমি মনে করি, যেহেতু বিষয়টি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে একটি বিতর্কের তৈরি হয়েছে, সেহেতু এটি চালু না করাই ভালো হবে। বিনিয়োগকারীরা এটি নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, এটি স্পষ্ট। তাই, বিরোধ প্রতিক্রিয়া এড়াতে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ‘পিই রেশিও’ ব্যবস্থা বহাল রাখা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে।
এদিকে গত ১৪ জুলাই বিএসইসির ১০২০তম কমিশন সভায় মার্জিন বিধিমালা সংশধনের প্রস্তাবটি (খসড়া) অনুমোদনের পর থেকেই বাজার নেতিবাচক আচরণ শুরু করেছে। এতে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বড় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স পাঁচ হাজার ২০০ পয়েন্ট থেকে ছয় হাজার পয়েন্টের ঘরে পৌঁছানোর দ্বারপ্রান্তে এসে নিম্নমূখী হয়ে পড়েছে। বাজার নিম্নমুখী অবস্থানে বাঁক নেওয়ার পেছনে ‘পিবি রেশিও’ প্রস্তাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ গত সপ্তাহে (১৯-২৩ জুলাই) ডিএসইএক্স সূচকটি ৯৬ পয়েন্টে কমে পাঁচ হাজার ৮০৪ পয়েন্টে নেমেছে। এই সপ্তাহে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বীমা কোম্পানির মধ্যে ৫৪টির দাম কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে মাত্র চারটির দাম।
এ বিষয়ে মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশিকুর রহমান বলেন, বর্তমান কমিশন শুরু থেকেই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করার মানসিকতা দেখিয়েছেন। আর প্রস্তাবিত ড্রাফটটির (খসড়া) ওপর মতামত দেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় রয়েছে। যদি কোনো নিয়ম বাজারের ওপর নেতিবাচক বা অযৌক্তিক প্রভাব ফেলে, তবে বিনিয়োগকারী ও স্টেকহোল্ডারদের উচিত যুক্তিসহ তা কমিশনের কাছে পেশ করা। আশা করা যায়, কমিশন জনস্বার্থে সেই বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন।
তবে এই বাজার অংশীজন মনে করেন, কমিশনের ড্রাফটটি প্রকাশ করার আগেই কী প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, সেটি বিশ্লেষণ করা উচিত ছিল। শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) বা শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) যেটি ধরেই রেশিও করা হোক না কেন, তাতে কোনো আপত্তি নেই। আবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য যেই ‘পিবি রেশিও’ প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি নিয়েও কোনো আপত্তি নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই রেশিওটি তিন ধরা হয়ে থাকে। তবে বীমা কোম্পানির জন্য ‘পিবি রেশিও’ এক প্রস্তাব করার আগে কমিশনের আরো বিশ্লেষণ করা উচিত ছিলো। যেহেতু, কয়েকটি বাদে সবগুলো বীমা কোম্পানিই এখানে মার্জিন ঋণের সুবিধার বাইরে থাকবে, সেহেতু এটি যৌক্তিক প্রস্তাব হয়নি।
এ বিষয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, আমরা প্রথমে যখন কোনো চেঞ্জ দেখতে পাই, তখন সেটি না বুঝতে পেরে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। ‘পিই রেশিও’ আদিকাল থেকে চলে এসেছে। এটি সবার কাছে পরিচিত। কিন্তু ‘পিবি রেশিও’ নামটা নতুন শুনে তারা বুঝতে পারছে না। অথচ এটিও একটি ইন্টারন্যাশনাল প্র্যাকটিস। বিষয়টি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি খসড়া মতামতের জন্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, এটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। মতামত নেওয়ার পর আপনারা যখন ফাইনাল বিধিমালাটি দেখতে পাবেন তখন বুঝতে পারবেন যে আমরা কী সিদ্ধান্তটা নিলাম।
তিনি বলেন, যেহেতু মার্কেট এটি বুঝতে পারছে না অথবা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। অর্থাৎ মার্কেটে একটা বড় নীতিবাচক প্রভাব এসেছে এটার জন্য, সেহেতু অবশ্যই আমরা এটিকে রিভিউ (পর্যালোচনা) করবো। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে সেটি যখন কার্যকর হয়, তখন ‘হিতেবিপরীত’ হয়ে যেতে পারে। আমাদের কমিশন মার্কেট বান্ধব। বিনিয়োগকারীদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। শুধু এটি নয়; আরো যদি কোনো বিষয়ে যুক্তিসংগত আপত্তি আসে সেগুলোও আমরা রিভিউ করব।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

