Logo

অর্থনীতি

উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে

তীব্র গ্যাস সংকটে পোশাকশিল্প

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ২১:২৩

তীব্র গ্যাস সংকটে পোশাকশিল্প

ছবি: সংগৃহীত

গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে থাকা তৈরি পোশাক খাত আরো বেশি সংকটে পড়েছে। এই সংকট এখন এতটাই বেড়েছে যে, চাহিদার অর্ধেক পণ্য উৎপাদনেই হিমশিম খাচ্ছে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অধিক সম্ভাবনাময় এই খাতটি পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা ও আমদানিনির্ভর নীতির কারণেই এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা এবং এর আশপাশ এলাকাগুলোÑ নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ এবং গাজীপুরে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গ্যাস পাচ্ছে না কারখানাগুলো। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বস্ত্র খাত। কারণ, এখানে সবচেয়ে বেশি গ্যাস লাগে। ফলে এ খাতের বেশির ভাগ কারখানাই তাদের সক্ষমতার ৫০ শতাংশের কম ব্যবহার করতে পারছে বলে অভিযোগ করেন বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি এম এ হাতেম বলেন, এটি একটি বড় জাতীয় সংকট। সরকার ইচ্ছা করলেই এটি রাতারাতি সমাধান করে ফেলবে- এমন পরিস্থিতি বাস্তবে নেই। তবে সরকার উদ্যোগ নিলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। এর আগে সরকারের কিছু পদক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও অতিসম্প্রতি সংকটটি আবারও খুব প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে, গ্যাস ও জ¦ালানির অভাব তীব্র হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, চলমান কারখানাগুলোর অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

এ সংকট উত্তরণে দুটি প্রধান পথ রয়েছে বলে জানান এম এ হাতেম। তিনি জানান, প্রথমত, শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে সাময়িক ও আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বহু বছর ধরে অবহেলিত থাকা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনের জোরালো ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে, দ্রুত সময়ের মধ্যে জ¦ালানি সংকট নিরসন করা না গেলে বিদ্যমান ইন্ডাস্ট্রিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বন্ধ কারখানা চালু করার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা-ও বাস্তবায়িত হবে না।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, অনেক কারখানা গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু এলাকায় পাওয়া গেলেও তা কারখানা চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে রুগ্ন হয়ে যাচ্ছে পোশাক ও বস্ত্র খাত। দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন কারখানার মালিকরা। এ দায় সরকারকে নিতে হবে। সরকার শিল্পমালিকদের সুরক্ষা দিতে পারছে না। আর দেশীয় শিল্পমালিকরা ভালো না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ আশা করা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকায় প্রতিযোগী কয়েকটি দেশের তুলনায় তৈরি হয়েছে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থান। কিন্তু শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব নয়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের জ¦ালানি সংকট দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শুধু শুল্ক সুবিধা যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ সুবিধা কাজে লাগাতে উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজন বাড়ানোর পাশাপাশি জ¦ালানি সংকট, উচ্চ সুদহার ও অর্থায়ন সমস্যার সমাধান জরুরি।

শিগগির কাটছে না গ্যাস সংকট: কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। বর্তমানে টার্মিনালটির মেরামতকাজ শুরু হলেও চলতি মাসে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে সহসাই কাটছে না দেশের গ্যাস সংকট।

দেশে আমদানিকৃত এলএনজি পুনঃবাষ্পীভবন (রিগ্যাসিফিকেশন) করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ) রয়েছে, যাদের সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। তবে ওই অগ্নিকাণ্ডের পর একটি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে গ্যাসের তীব্র সংকট।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে সরবরাহ করা হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট, ফলে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। দৈনিক চাহিদার বিপরীতে ৩০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ঘাটতি বেড়ে এখন তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশে।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাসের এ সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এটির মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। তবে, এ মাসের মধ্যে তা ঠিক হবে না, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

আবাসিকেও চরম ভোগান্তি: তীব্র গ্যাস সংকটের ফলে শিল্প কারখানার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন আবাসিকের গ্রাহকরাও। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকছে না। ফলে রান্নাবান্নাসহ আনুষঙ্গিক কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১৯০ কোটি ঘনফুটের মতো। এলএনজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় তা ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। টার্মিনাল ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ঘাটতি পূরণ করা যাবে না।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ গাড়ির লাইন: সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর প্রায় প্রতিটা ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় গ্যাস নিতে আসা যানবাহনের সারি বেড়েই চলেছে।

বুধবার রাজধানীর মুগদা শান্ত সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে সিএনজির দীর্ঘ লাইন। এই স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা সিএনজিচালক আবদুল জব্বার বলেন, যে স্টেশনেই যাচ্ছি, সেখানেই বলা হচ্ছে গ্যাস নেই। এখানে গ্যাস থাকলেও চাপ কম। সবাই চাহিদামতো পাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। 

আরেকজন সিএনজি চালক বলেন, দৈনিক ট্রিপের জন্য যে পরিমাণ গ্যাস দরকার, তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ট্রিপ কমাতে হচ্ছে, এতে করে উপার্জনও কমে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি করা জ¦ালানির ওপর অতিনির্ভরতা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এ সংকট কাটাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়া প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি জ¦ালানির সংকট কাটাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে গ্যাসের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তা উত্তোলনে মনোযোগ না দিয়ে আমদানিতেই জোর দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার নতুন কূপ খননে উদ্যোগ নিয়েছে, তবে তা আরও আগেই গ্রহণ করা দরকার ছিল। তাতে করে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতো। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন