ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা ৯২৭ কোটি টাকার বেশি অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কেউ কেউ আবার অর্থ ফেরতের জন্য আরও সময় চেয়েছে। ফলে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আটকে থাকা এই অর্থ উদ্ধারে এবার আইনি পথে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইসিবি।
আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, আমরা অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান অর্থ ফেরত দিতে না পারার কথা জানিয়েছে এবং এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। কেউ কেউ আরও সময় চেয়েছে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের জবাবে আইসিবি সন্তুষ্ট নয়। এখন খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে আইনি মতামত নেওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আইসিবির কর্মকর্তারা জানান, খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই— এমন স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়ার পর মামলা করার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে করপোরেশন। অর্থ উদ্ধারে সম্ভাব্য সব পথেই চেষ্টা করা হয়েছে। এখন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
১৯৭৬ সালে দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় আইসিবি। পুঁজিবাজারে সহায়তার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি আমানত (এফডিআর) হিসেবে বিনিয়োগ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে পুঁজিবাজারে মন্দাভাব চলার মধ্যে আইসিবি একটি ব্যাংক ও ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ৬৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এফডিআর হিসেবে বিনিয়োগ করে। এসব আমানতের সুদের হার ছিল বছরে ৯ থেকে ১২ শতাংশ। সুদসহ ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে এসব এফডিআরের বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৯২৭ কোটি টাকা। আইসিবির বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আইসিবির অর্থ আটকে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফার্স্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট এবং ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। এছাড়াও পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডে প্রতিষ্ঠানটির বড় অঙ্কের অর্থ আটকা পড়েছে।
আইসিবির এক কর্মকর্তা জানান, অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি করপোরেশনের পরিচালনা পর্ষদের সভায় আলোচনা হয়েছে। সভায় এ বিষয়ে আরও আইনগত ও বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থ উদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চেয়েও কাজ হয়নি। পাওনা পরিশোধের দাবিতে বারবার চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারে বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর ধরে নানা উদ্যোগের পরও অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুরবস্থা এবং মালিকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
গত জানুয়ারিতে তীব্র তারল্যসংকটে থাকা এবং টিকে থাকার জন্য সরকারের সহায়তা চাওয়া আইসিবি বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃথকভাবে আইনি নোটিস দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে আইসিবির অর্থ আটকে রয়েছে। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের মূলধন ফেরত দিতে পারেনি।
এফডিআরের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় এসব বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত খেলাপি সম্পদে পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে আইসিবিকে। এতে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি।
আইসিবির কর্মকর্তারা জানান, সাবেক উদ্যোক্তা ও মালিকদের অর্থ আত্মসাতের কারণে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আইসিবিকে জানিয়েছে, তারা এখন অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবার অর্থ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েছে।
এদিকে আর্থিক অনিয়ম, ব্যবসা পরিচালনায় ব্যর্থতা এবং গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে না পারায় চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
আইসিবি জানিয়েছে, উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৫ সাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছিল। শুরুতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত সুদ পরিশোধ করলেও ২০১৯ সালের দিকে এফডিআরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর সুদ ও মূলধন— দুটিই পরিশোধে খেলাপি হতে শুরু করে।
আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চেয়েছিল আইসিবি। পাশাপাশি খেলাপি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে করপোরেশন। কিন্তু বছরের পর বছর আলোচনা এবং একাধিক লিখিত সতর্কবার্তার পরও অর্থ উদ্ধারে সফলতা আসেনি। ফলে স্বেচ্ছায় অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছে আইসিবি। এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আইসিবির লোকসানের বোঝা বাড়িয়েছে এফডিআর: আইসিবির কর্মকর্তারা জানান, এসব খেলাপি এফডিআর এখন করপোরেশনের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুল অঙ্কের খেলাপি বিনিয়োগের বিপরীতে বাধ্যতামূলক প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে গত অর্থবছরে আইসিবি ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসান করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে আইসিবির সবচেয়ে বেশি এফডিআর আটকে আছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে আইসিবির পাওনা ১৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
আইসিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ব্যাংকের কাছে আইসিবির এফডিআরের পাওনা ১৬২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ফার্স্ট ফাইন্যান্সের কাছে ১৬১ কোটি ৯ লাখ, ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কাছে ১৩৪ কোটি ৭৫ লাখ, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কাছে ৭৪ কোটি ২৩ লাখ, এফএএস ফাইন্যান্সের কাছে ৫৬ কোটি ৯৪ লাখ এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের কাছে ৪৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।
এ ছাড়া পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টেও আইসিবির এফডিআর রয়েছে।
একটি এনবিএফআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা এই মুহূর্তে আমানতের অর্থ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে অসহায়। যথাযথ কাগজপত্র বা জামানত ছাড়াই বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে তাদের প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, বস্তুতপক্ষে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছুই নেই। এখন তারা ওই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থ আদায় করতে পারছে না, এতে আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না।
যেভাবে এই সংকট তৈরি হলো: আর্থিক সংকটে থাকা এনবিএফআই ও পদ্মা ব্যাংকের কাছে বছরের পর বছর এসব এফডিআর বকেয়া পড়ে থাকলেও আইসিবি এত দিন তা পাওনা হিসেবে দেখিয়ে আসছিল। ফলে আটকে থাকা অর্থের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনও সংরক্ষণ করা হয়নি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ এসব অনাদায়ী বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি মোট ৭৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করে। এর মধ্যে অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে ৫৮৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা রাখা হয়। এর বড় অংশই ছিল খেলাপি এফডিআরের জন্য। বিপুল এই প্রভিশন সংরক্ষণই শেষ পর্যন্ত আইসিবির এক হাজার ২১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর আগের অর্থবছরে আইসিবি ৩২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

