জাপান থেকে গাড়ি আমদানী
যে বিষয়গুলো যাচাই না করলে পরে পড়তে পারেন বড় ঝুঁকিতে
তাসনিম আদনান
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৬
জাপান থেকে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ক্রেতাদের একটি বড় অংশ পরিচিতজন, আত্মীয় কিংবা জাপানে বসবাসরত বন্ধুর সহায়তা নেন। উদ্দেশ্য সাধারণত একটাই—মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে পছন্দের গাড়ি তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে দেশে আনা।
কিন্তু এখানে
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পরিচিত মানুষ গাড়ি এনে দিচ্ছেন মানেই পুরো
প্রক্রিয়াটি নিরাপদ বা ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ একটি গাড়ি জাপানের auction বা বিক্রেতার
কাছ থেকে কেনার পর বাংলাদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে। গাড়ির প্রকৃত
condition, auction history, chassis number, export documents, shipping, customs
valuation, duty-tax এবং registration—প্রতিটি ধাপেই
আলাদা যাচাই প্রয়োজন।
তাই প্রশ্ন হওয়া
উচিত শুধু, “গাড়ির দাম কত?” নয়। বরং—“গাড়িটি কোথা থেকে
কেনা হচ্ছে, কী অবস্থায় আছে, কোন কাগজে আসছে এবং বাংলাদেশে হাতে পেতে মোট কত টাকা লাগবে?”
১. প্রথম প্রশ্ন:
গাড়িটি কোথা থেকে কেনা হচ্ছে? পরিচিতজন যদি বলেন, “জাপান থেকে গাড়ি
এনে দেব”, তাহলে প্রথমেই
জানতে হবে গাড়িটি কোথা থেকে কেনা হবে।
গাড়িটি কি—Japanese
auction থেকে? সরাসরি dealer-এর কাছ থেকে? কোনো exporter-এর মাধ্যমে? নাকি ব্যক্তিগত
মালিকের কাছ থেকে?
Auction থেকে
কেনা হলে auction house-এর নাম, auction date এবং lot number চাওয়া উচিত। এর কারণ,
গাড়ির পরিচয় ও condition সম্পর্কে পরবর্তী যাচাইয়ের জন্য এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
২. Auction
Sheet—গাড়ির অতীত জানার
গুরুত্বপূর্ণ দলিল
জাপানের ব্যবহৃত
গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে auction sheet অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি হতে পারে। এতে গাড়ির
condition, mileage, interior/exterior condition এবং বিভিন্ন defect বা repair সম্পর্কে
তথ্য থাকতে পারে।
তাই শুধু গাড়ির
ছবি দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে auction sheet দেখতে হবে। তবে auction sheet বুঝতে সমস্যা
হলে অভিজ্ঞ automotive professional দিয়ে যাচাই করানো ভালো।
৩. Chassis
Number: গাড়ির পরিচয়ের মূল চাবিকাঠি। একটি গাড়ির chassis/VIN number তার পরিচয়ের অন্যতম
প্রধান ভিত্তি। ক্রেতার উচিত গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোতে একই chassis number আছে কি না
যাচাই করা।
সম্ভব হলে মিলিয়ে
দেখতে হবে:
Auction
document
↓
Purchase/Invoice
↓
Japanese
export document
↓
Bill of
Lading
↓
Customs
documents
↓
বাংলাদেশের
registration documents
কোথাও অসঙ্গতি
দেখা গেলে বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত লেনদেন এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়।
৪. Mileage কম
হলেই গাড়ি ভালো—এমন নয়
গাড়ি কেনার সময়
কম mileage অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়। কিন্তু শুধু dashboard-এর সংখ্যা দেখে গাড়ির প্রকৃত
ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। Auction-এর সময় গাড়িটির mileage কত ছিল,
সেটি জানতে হবে। এরপর export বা অন্যান্য documents-এর তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
এ ছাড়া steering wheel, driver's seat, pedals, gear knob সহ গাড়ির ব্যবহারের চিহ্নও
বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
সহজ নিয়ম: Auction
mileage → Export
information → বর্তমান mileage এই তিনটি তথ্যের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য
থাকা দরকার।
৫. Accident
history লুকানো আছে কি না?
একটি গাড়ি বাইরে
থেকে ঝকঝকে হলেই সেটি accident-free—এমন নিশ্চয়তা
নেই। বিশেষ করে used/reconditioned গাড়ির ক্ষেত্রে জানতে হবে: গাড়িটি আগে বড় দুর্ঘটনায়
পড়েছিল কি না, chassis বা structural অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কি না, কোনো body
panel পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, repaint করা হয়েছে কি না, flood বা water damage-এর
ইতিহাস আছে কি না এখানে শুধু বিক্রেতার বক্তব্য নয়, available documents এবং প্রয়োজনে
independent inspection বিবেচনা করা উচিত।
৬. জাপানের
Export Documents কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জাপান থেকে
registered used vehicle export করার ক্ষেত্রে registration deletion এবং export-সংক্রান্ত
নির্দিষ্ট certificate ব্যবহৃত হয়। Japan Customs-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানির
ক্ষেত্রে Certificate of Registration Deletion বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে
Certificate of Notice of Planned Export-এর মতো নথি প্রয়োজন হতে পারে।
তাই পরিচিতজনকে
প্রশ্ন করা যেতে পারে:
“গাড়িটির
Japanese export/deregistration documents কী কী থাকবে এবং সেগুলোর কপি কি আমি দেখতে
পারব?” এটি অবিশ্বাস
নয়; আন্তর্জাতিক গাড়ি আমদানির স্বাভাবিক documentation যাচাইয়ের অংশ।
৭. JAAI
Certificate-এর বিষয়টিও জানতে হবে
জাপান থেকে পুরোনো
গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ Customs-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে
Japan Auto Appraisal Institute বা JAAI থেকে বয়স, model number ও chassis number-সংক্রান্ত
certificate প্রয়োজন হতে পারে। তবে গাড়ির ক্ষেত্রে বর্তমান প্রযোজ্য Import Policy
ও Customs requirements যাচাই করা জরুরি, কারণ নীতিমালা ও প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হতে
পারে।
৮. গাড়ির দাম
আর মোট খরচ—দুটি এক নয়
এখানেই অনেক ক্রেতা
সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হন।
ধরা যাক পরিচিতজন
বললেন—
“গাড়িটির দাম ১৫
লাখ টাকা।” সঙ্গে সঙ্গে জানতে হবে, এই ১৫ লাখ টাকার মধ্যে কী
কী আছে। সম্ভাব্য খরচগুলো আলাদা করে হিসাব করতে হবে:
Japan
purchase price, Auction fee, Exporter fee, Japan-এর inland transportation, Port/handling
charge, Freight, Insurance, Customs duty, VAT/অন্যান্য applicable taxes, C&F
বা clearance charge, Port-related charges, Registration-related expenses
অর্থাৎ
purchase price ≠ final landed cost।
৯. Customs
valuation বুঝুন
গাড়ি কেনার আগে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো Customs valuation।
অনেকে মনে করেন,
“জাপানে গাড়িটি
১৫ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে, তাই Customs-ও ১৫ লাখ টাকার ওপর হিসাব করবে।” কিন্তু বাস্তবতা
আরও জটিল। বাংলাদেশ Customs-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, used/reconditioned motor
vehicle-এর customs valuation নির্ধারণে গাড়ির cylinder capacity, manufacturing
year, model code, chassis numberসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। NBR
Customs-এর একটি প্রকাশিত নির্দেশনায় Japan-origin used/reconditioned vehicles-এর
ক্ষেত্রে Japan-এর updated Yellow Book-এর মূল্যায়ন ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে
Customs-এর বর্তমান valuation ও duty structure সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই
নির্দিষ্ট গাড়ির জন্য বর্তমান NBR Customs rules ও applicable HS code অনুযায়ী হিসাব
করা উচিত।
১০. Duty-Tax
সম্পর্কে আগে জানুন
একই ধরনের দেখতে
দুটি গাড়ির ক্ষেত্রেও engine capacity, vehicle type, fuel type, hybrid/EV
classification এবং অন্যান্য tariff classification অনুযায়ী duty-tax-এর হিসাব আলাদা
হতে পারে। বাংলাদেশ Customs-এর tariff schedule-এ বিভিন্ন vehicle category ও
engine capacity অনুযায়ী আলাদা HS classification রয়েছে।
এ কারণে পরিচিতজনের
দেওয়া শুধু একটি মোট অঙ্ক শুনে সিদ্ধান্ত না নিয়ে written cost breakdown নেওয়া ভালো।
১১.
Shipping-এর তথ্যও আপনার জানার অধিকার
গাড়ি জাপান থেকে
shipment হওয়ার পর ক্রেতার কাছে অন্তত shipment-related তথ্য থাকা উচিত।
জানতে পারেন:
কোন port থেকে গাড়ি পাঠানো হয়েছে? Vessel-এর নাম? Shipment date? Bill of Lading
number? Container/RoRo shipment? সম্ভাব্য arrival date?
বাংলাদেশ
Customs-এর সাধারণ import clearance documentation-এর মধ্যে invoice, Bill of
Lading/AWB, packing list, country-of-origin certificate, insurance এবং VAT/BIN-সংক্রান্ত
নথি রয়েছে। গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অতিরিক্ত documentation আলাদাভাবে থাকতে পারে।
১২. পরিচিতজনকে
টাকা দেওয়ার আগে লিখিত হিসাব নিন
পরিচিতজন হওয়ার
কারণে অনেকে কোনো লিখিত agreement করেন না। এখানেই ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি
হতে পারে। অন্তত লিখিতভাবে উল্লেখ থাকা উচিত:
গাড়ির model,
Model year, Chassis number, Agreed specification, Purchase price, Estimated
total cost, Payment schedule, Shipping responsibility, Customs/tax
responsibility, Registration responsibility, Delivery timeline.
গাড়ির
specification পরিবর্তিত হলে বা agreed condition-এর সঙ্গে গাড়ি না মিললে কী হবে—সেটিও লিখিত রাখা
ভালো।
১৩. টাকা কাকে
দেবেন?
এটিও অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। জেনে নিন: টাকা কার কাছে যাবে? জাপানের exporter কে? বাংলাদেশে
importer কে? কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হলে প্রতিষ্ঠানের invoice/receipt দেওয়া হবে
কি না? Advance কত? Balance payment কখন? Refund-এর শর্ত কী? সম্ভব হলে প্রতিটি
payment-এর documentary record সংরক্ষণ করা উচিত।
১৪. গাড়ি বাংলাদেশে
আসার পর দায়িত্ব কার?
গাড়ি বন্দরে পৌঁছানোর
পরও কাজ শেষ নয়। আগেই জেনে নিন: Customs clearance কে করবে? C&F agent কে? Duty-tax
কে পরিশোধ করবে? Port থেকে গাড়ি কে ছাড়াবে? Registration কে করবে? কাগজপত্রে কোনো সমস্যা
হলে দায়িত্ব কার?
বাংলাদেশ
Customs-এর import process-এ Bill of Entry/Declaration এবং সংশ্লিষ্ট supporting
documents জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে; nominated C&F agent বা importer প্রক্রিয়াটি
সম্পন্ন করতে পারে।
শেষ কথা
জাপান থেকে পরিচিতজনের
মাধ্যমে গাড়ি আনা অনেকের জন্য সুবিধাজনক একটি পথ হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক একটি
গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি গাড়ির পরিচয়, auction
history, documentation, shipping, customs valuation, duty-tax এবং মোট খরচ—সবকিছু যাচাই
করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হলো, গাড়ির ছবি দেখে নয়, কাগজপত্র দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ একটি ভালো গাড়ি কেনার
প্রথম শর্ত শুধু ভালো গাড়ি খুঁজে পাওয়া নয়; বরং সঠিক গাড়ি, সঠিক তথ্য এবং সঠিক কাগজপত্র
নিশ্চিত করা।
ক্রেতার মূলমন্ত্র
হতে পারে—“গাড়ি দেখুন, কাগজ
দেখুন, হিসাব দেখুন—তারপর সিদ্ধান্ত নিন।”

