Logo

শিক্ষা

শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনা-১২

তাফসীর বিভাগ ও কোরআন গবেষণা কেন্দ্র আরও সমৃদ্ধ হোক

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২৯

তাফসীর বিভাগ ও কোরআন গবেষণা কেন্দ্র আরও সমৃদ্ধ হোক

দেশের মাদরাসাগুলোতে তাফসীর বিভাগের বর্তমান অবস্থা জানার তীব্র আগ্রহ থেকে আমি একটি জরিপ পরিচালনা করি। উদ্দেশ্য ছিল- এই বিভাগের সিলেবাস কী, তালেবে ইলমদের মধ্যে কেন তাফসীরের প্রতি অনাগ্রহ, এবং সমস্যার শিকড় কোথায়- তা অনুধাবন করা।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, তালেবে ইলমদের প্রবল আগ্রহ ফিকহে। আগ্রহ আছে আরবি আদবে। আগ্রহ আছে নাহু-সরফে-এমনকি সেখানে ভর্তি হয়ে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করার দিকেও। প্রশ্ন জাগে- জেনারেল এডুকেশনে কেউ কি মাস্টার্স শেষ করে আবার ফাইভের ব্যাকরণ শিখতে ভর্তি হয়? কোনো অভিভাবক কি এমন পাগলামি মেনে নেবেন?

কিন্তু বাস্তবতা হলো- এক যুগ ধরে আরবি কিতাব পড়ে, দাওরা শেষ করে ‘মাওলানা’ বা ‘ফারেগ’ হয়ে ইবারত শুদ্ধভাবে পড়তে না পারার কারণে আবার ছুটতে হয় যাত্রাবাড়ীর তথাকথিত ‘মাদরাসা পাড়ায়’। যাদের সঙ্গে কথা বলা হয়, তারা এমনভাবে ঈমান ‘ঠিক করার’ কথা বলেন, যেন মাদরাসায় পড়েও তাদের ঈমান ঠিক হয়নি- যেমনটা বলা হয় চিল্লায় বের না হলে ঈমান ঠিক হয় না।

যে ছাত্র মীযান থেকে দাওরা পর্যন্ত কোরআন, উলূমুল কোরআন, ফিকহ, উসূলে ফিকহ, তাফসীর, উসূলে তাফসীর, হাদীস ও উসূলে হাদীস পড়েছে- সে যদি ইবারতই পড়তে না পারে, তাহলে তাকে কীভাবে শরীয়াহর মৌলিক ভাষা আরবিতে রচিত হাজার হাজার পৃষ্ঠার কিতাব পড়ার যোগ্য মনে করা হলো? যে ছাত্র মুরাব–মাবনি বোঝে না, বাব ও খাসিয়াত চেনে না- সে দাওরায় কীভাবে তরক্কি পেল?

শুধু তথাকথিত ‘বরকতের’ নামে জীবন নষ্ট করার কি আদৌ প্রয়োজন আছে? সময় কি এতটাই সস্তা? অভিভাবকরা যদি জানতেন তাঁদের সন্তানের এই অপচয়- তাহলে হয়তো অলসতার এই বিলাসিতা এত সহজ হতো না। কিন্তু যাঁরা সন্তানকে ‘আলেম’ বানাতে মাদরাসায় দিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই কিতাবের নাম, মারহালা কিংবা মুমতাজ-মকবুলের অর্থই বোঝেন না। মান্নত বা আবেগের বশে ভর্তি—-জিম্মাদারি শেষ।

তালেবে ইলমের জীবনে ‘ফারেগ’ ও ‘তাকমীল’ শব্দ দুটি এক ধরণের আত্মপ্রতারণা। ছুটি তো আরও ভয়ঙ্কর। আলেমদের জীবনে ফারাগাত নেই, তাকমীল নেই- তাঁরা আমৃত্যু ইলমের সাগরে সাঁতার কাটবেন। ইলমের বাগানে আজীবন বিচরণ করবেন। সেখান থেকে আহরিত সুবাস সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন।

যে ছাত্র ইবারত পড়তে পারে না, তার ইলমি বাগানে প্রবেশের অধিকার নেই। আগে নাহু-সরফের গাছ রোপণ করতে হবে, আরবি ভাষার ডানায় উড়তে শিখতে হবে। এরপর ইলমের সাগর পারি দেওয়া। কিন্তু আমরা উল্টোটা করছি- সাগর পাড়ি দিয়ে পরে সাঁতার শিখতে চাই। গাছ না লাগিয়েই বছরের পর বছর কল্পিত ফল খাই।

দাওরার পর বাস্তবতায় চোখ খুলে দৌড় শুরু হয় নাহু-সরফ ও আদবের কথিত কোর্সে। পিতার অর্থে আবার ‘ওয়ান’-এ ভর্তি। আবার ইসম-হরফের পরিচয়। অথচ এবার আর তাকমীলের মতো বিনা খরচে নয়-মাসিক ফি দিতে হয়। লাভও আছে- নূরানি পদ্ধতির নামে রামাযানে আবার সময় নষ্ট করা যায়, নাহবেমী পড়ে মুআল্লিম হওয়া যায়, কিছু হালাল আয়ও হয়।

ইাহু-সরফ ও ইফতা বিভাগের চাপে তাফসীরসহ অন্যান্য বিভাগ আজ মৃতপ্রায়। বহু মাদরাসায় তালেবে ইলম ও যোগ্য ছাত্রের অভাবে তাফসীর বিভাগ খুলে আবার বন্ধ করতে হয়েছে। কোথাও যারা ফিকহ বা হাদীসে বাদ পড়েছে, তাদের ‘তাফসীরের উপযুক্ত’ বলে বেছে নেওয়া হয়েছে।

আমি এক বছর তাফসীর বিভাগে মাবাহিস ফি উলূমিল কোরআন পড়িয়েছি। বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার টেবিলে দশটির বেশি তাফসীর থাকে- প্রতিদিন ফজরের পর কোরআনের সঙ্গে এক অপার্থিব সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কোরআন বিস্ময়। অপার বিস্ময়। প্রশান্তি শুধুই প্রশান্তি। এই ইলমকে অবহেলা করে কি আলেম হওয়া যায়? শুধু জালালাইন পড়ে কি সেই সাগরের মুক্তো পাওয়া সম্ভব? আরবরা যাকে তাফসীরুন জাফফুন বলে- সেটিই কি আমাদের একমাত্র তাফসীর? বাইদাবীর এক পারা পড়াই কি তাফসীর অধ্যয়ন?

ইবনে কাসীর, তাবারী, কুরতুবী, কাশশাফ, ফি জিলালিল কোরআন-এগুলো কোথায়? পুরো কিতাব না পড়ালেও নির্বাচিত অংশ তো সিলেবাসে রাখা যেত। কিন্তু জালালাইনের ওপর এমন নির্ভরতা কেন—যেটি মুরাবও হয় না?

প্রস্তাবনা

১. দেশে জেলায় জেলায় অথবা কেন্দ্রীয়ভাবে উলূমুল কোরআন ও তাফসীর বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হোক।

২. বিদ্যমান বিভাগগুলোতে প্রাচীন ও আধুনিক তাফসীরসমৃদ্ধ বিশেষায়িত মাকতাবাতুত তাফাসীর গড়ে তোলা হোক।

৩. দেশি-বিদেশি মুফাসসিরদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস কমিটি গঠন করা হোক, যারা দুই বা চার বছরের গবেষণাভিত্তিক সিলেবাস প্রণয়ন করবেন।

৪. তাফসীরে পারদর্শী ফন্নি উস্তায দ্বারা পাঠদান নিশ্চিত করা হোক।

৫. গবেষণার স্বীকৃত পদ্ধতিতে পাঠদান, মুহাদারা ও বিশেষায়িত অধ্যয়ন চালু করা হোক।

৬. বিজ্ঞান-সংক্রান্ত আয়াতগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হোক।

৭. কিতাব হবে সূত্র, পাঠ হবে উলূমুল কোরআনের বিষয়ভিত্তিক অধ্যয়ন।

দেশে এখনও তাফসীর বিভাগ ও কিতাব আছে- অভাব কোরআনের প্রতি ভালোবাসার। নাহু-সরফ, আদব- সবই তো কোরআনের জন্য। তাহলে এই বিভাগের প্রতি অবহেলা কেন?

ওয়াজ মাহফিল ও চার লক্ষাধিক মসজিদে তাফসীরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ডিমান্ড আছে- সাপ্লাই নেই। এই ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের ভারসাম্য আনতেই হবে। এই বিভাগকে আরও সরব, সতেজ ও কার্যকর করার উদ্যোগ এখনই নেওয়া প্রয়োজন।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক ও পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

মাদরাসা শিক্ষা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর