৫০ প্রজাতির গাছ নিয়ে কুবির ফার্মেসি বিভাগের ঔষধি বাগান
কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০৮
ছবি: সংগৃহীত
মানুষের চিকিৎসার ইতিহাসের সঙ্গে ঔষধি গাছের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আধুনিক হাসপাতাল, ওষুধ কিংবা চিকিৎসা প্রযুক্তির অনেক আগে মানুষ অসুস্থ হলে আশ্রয় নিত প্রকৃতির কাছে। গাছের পাতা, ছাল, শিকড়, ফুল, ফল ও বীজ ব্যবহার করেই তৈরি হতো নানা ধরনের ভেষজ চিকিৎসা। প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় আয়ুর্বেদের দীর্ঘ ঐতিহ্যের পাশাপাশি লোকজ চিকিৎসার ধারাতেও নিম, তুলসী, হরীতকী, বহেড়া, আমলকী, অর্জুনসহ অসংখ্য উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সময়ের সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও সেই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং আধুনিক বিজ্ঞান বিভিন্ন উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান ও সম্ভাব্য ঔষধি কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করছে। ফলে প্রাচীন ভেষজ জ্ঞান ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন এক সংযোগ।
বাংলাদেশেও ঔষধি গাছের ব্যবহার বহু পুরোনো। গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এসব গাছের উপস্থিতি এখনো চোখে পড়ে। সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাধারণ অসুস্থতায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ভেষজ জ্ঞানের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মানুষ স্থানীয়ভাবে পরিচিত উদ্ভিদের ওপর প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে থাকেন।
এই দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে গড়ে তোলা হয়েছে ঔষধি বাগান। ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঔষধি বাগান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরবর্তী বছর, ২০১৫ সাল থেকে বাগানের সৌন্দর্যায়ন ও গাছ লাগানোর কাজ শুরু হয়। ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী সংগঠন ফার্মেসী সোসাইটির উদ্যোগে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হতে থাকে বাগানটি। বর্তমানে এখানে রয়েছে প্রায় ৫০ এর অধিক ঔষধি গাছ।
ক্যাম্পাসের সবুজ পরিবেশের মধ্যে গড়ে ওঠা এই বাগানে রয়েছে হাসনাহেনা, হরীতকী, চুইঝাল, কর্পূরদাম, পেনসিল ক্যাকটাস, আমলকী, তেজপাতা, ডালিম, দারুচিনি, তেঁতুল, সাদা জবা, নিম, অর্জুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। পরিচিত এসব উদ্ভিদের অনেকগুলোই একদিকে আমাদের খাদ্য ও সংস্কৃতির অংশ, অন্যদিকে লোকজ চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে ভেষজ মানেই যে সম্পূর্ণ নিরাপদ, এমন ধারণা ঠিক নয়। কোনো উদ্ভিদ কীভাবে, কতটুকু এবং কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যায়-তা বৈজ্ঞানিকভাবে জানা জরুরি। ভুলভাবে বা অতিরিক্ত ব্যবহারে ক্ষতির আশঙ্কাও থাকতে পারে। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোকজ জ্ঞানকে সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে এর যথার্থতা ও নিরাপত্তা যাচাই করাও প্রয়োজন।
ঔষধি বাগানটির থাকায় ল্যাব এবং একাডেমিক ক্ষেত্রেও সুবিধা পাচ্ছে ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এনিয়ে বিভাগটির ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াবিদ আল ইজাজ বলেন, ফার্মেসি শিক্ষায় ঔষধি উদ্ভিদের গুরুত্ব অপরিসীম। শ্রেণিকক্ষে আমরা এসব উদ্ভিদের ঔষধি গুণাগুণ, সক্রিয় উপাদান ও ব্যবহার সম্পর্কে তাত্ত্বিকভাবে শিখি। তবে বিভাগের ঔষধি উদ্ভিদের বাগানে এসব উদ্ভিদ সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলে সেই শেখাটা আরও বাস্তব ও কার্যকর হয়। আমাদের ঔষধি উদ্ভিদ বাগান তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব উদ্ভিদজগতের সঙ্গে যুক্ত করার একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এটি আরও সমৃদ্ধ করা হলে শিক্ষা, গবেষণা ও ঔষধি উদ্ভিদ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিভাগের তথ্য মতে, বর্তমানে জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে বাগানে সব ধরনের ঔষধি উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। যদিও প্রতি বছর ভর্তি হওয়া নতুন ব্যাচ তাদের নিজেদের উদ্যোগে অল্প সংখ্যক গাছ রোপণ করেন। ভবিষ্যতে বাগানের পরিসর বাড়ানো, আরও প্রজাতি সংরক্ষণ এবং প্রতিটি উদ্ভিদের পরিচয় ও ঔষধি গুণ সম্পর্কে তথ্য সংযুক্ত করে নতুন ক্যাম্পাসে পুনরায় বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনিয়ে ফার্মেসি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যপক ড. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ঔষধি গাছের বাগানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে গাছগুলোর বৃদ্ধি ও পরিচর্যা করা। আলো-বাতাসের অভাব এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে ঔষধি গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। তা ছাড়া,না জেনে অনেকেই পাতা বা ফুল সংগ্রহ করতে গিয়ে ছোট ও সংবেদনশীল গাছগুলোর ক্ষতি করে ফেলছে।
তিনি আরো জানান, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় সুবিধার কথা শুনে তা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। নতুন ক্যাম্পাসে আধুনিক সুবিধা ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নিশ্চিত করে নতুনভাবে মেডিসিনাল গার্ডেন গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, পরিচর্যার কথা প্রশাসনকে জানালে তারা প্রাথমিকভাবে লোক দিলেও, সার্বক্ষণিক পরিচর্যার জন্য লোক নেই।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

