মাঠে ফিরছে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্য
জান্নাতুল লামিশা, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:১৪
ছবি: সংগৃহীত
বিকেলটা তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। দুপুরের রোদ আর আগের মতো তীক্ষ্ণ নয়। আকাশের এক পাশে সাদা মেঘ জমেছে। অন্য পাশে সূর্যের আলো এখনো মাঠের সবুজ ঘাস ছুঁয়ে আছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি নামছে হয়তো। বাতাসে তারই হালকা গন্ধ। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের দিকে এগিয়ে গেলে প্রথমে শোনা যায় কয়েকটি কণ্ঠ। তারপর চোখে পড়ে জার্সি পরা তরুণদের ছোটাছুটি। কেউ বল পায়ে নিয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ দূর থেকে সতীর্থকে ডাকছে। মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজনের চোখ তখনও খুঁজে ফিরছে প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের।
হঠাৎ বাঁশির শব্দে থেমে যায় চারপাশের ছোটখাটো ব্যস্ততা। বল গড়িয়ে যায় মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কয়েক জোড়া পা তার পেছনে ছুটতে থাকে। মাঠের বাইরে থেকে ভেসে আসে চিৎকার। কেউ বলে সামনে যেতে, কেউ বলে পাস দিতে। একটি দল গোলের কাছাকাছি পৌঁছালে মুহূর্তের জন্য থমকে যায় দর্শকদের কণ্ঠ। যেন সবাই একই সঙ্গে অপেক্ষা করছে একটি দৃশ্যের জন্য। তারপর গোল হলে সেই অপেক্ষা ভেঙে পড়ে উচ্ছ্বাসে। কেউ হাততালি দেয়, কেউ লাফিয়ে ওঠে, কেউ পাশে থাকা বন্ধুটিকে জড়িয়ে ধরে। কয়েক সেকেন্ডের সেই আনন্দে মনে হয়, এই গোলটি শুধু একটি দলের নয়। এই গোল যেন পুরো বিভাগের।
অক্টোবরের বিকেলগুলো এমনই। প্রকৃতি যখন ধীরে ধীরে ঋতু বদলের পথে হাঁটে, তখন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠেও বদলে যায় দিনের চেনা ছন্দ। কিছুদিন আগেও যে মাঠ হয়তো অপেক্ষা করছিল, সেখানে এখন মানুষের ভিড়। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে। কেউ খেলতে, কেউ খেলা দেখতে, কেউ আবার শুধুই বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে। বই আর খাতার বাইরে তখন খুলে যায় অন্য এক জগৎ। সেখানে পরীক্ষার নম্বর নেই, অ্যাসাইনমেন্টের চাপ নেই। আছে শুধু খেলা, প্রতিযোগিতা আর নিজের মানুষগুলোর জন্য একটু বেশি করে গলা মেলানোর আনন্দ।
মাঠে খেলছে ১১ জন। কিন্তু তাদের দৌড় কখনোই ১১ জনের মধ্যে আটকে থাকে না। একজন খেলোয়াড় বল নিয়ে এগিয়ে গেলে তার সঙ্গে এগিয়ে যায় পুরো বিভাগের আশা। গোলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোলরক্ষকের একটি সেভে যেমন উল্লাস ওঠে, তেমনি একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া হলে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আফসোস। মাঠের ভেতরে থাকা খেলোয়াড় আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকের মধ্যে তখন যেন কোনো আলাদা সীমানা থাকে না। একজনের উত্তেজনা অন্যজনের উত্তেজনা হয়ে যায়। একজনের হতাশাও ভাগ করে নেয় বাকিরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন মূলত ছুটে চলার জীবন। কখনো ক্লাসের জন্য ছুটতে হয়, কখনো অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার জন্য। কখনো পরীক্ষার প্রস্তুতি, কখনো প্রেজেন্টেশনের ব্যস্ততা। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে ফিরে যাওয়ার সময় অনেকেরই মনে হয়, আরেকটি দিন কেটে গেল। সেই একঘেয়ে ব্যস্ততার ভেতর ক্রীড়া প্রতিযোগিতা যেন হঠাৎ খুলে দেওয়া একটি জানালা। কয়েক ঘণ্টার জন্য শিক্ষার্থীরা নিজেদের অন্যভাবে দেখতে পান। যে শিক্ষার্থী সারাদিন বইয়ের পাতায় ডুবে থাকেন, তিনিই হয়তো বিকেলে জার্সি পরে মাঠে ছুটছেন। যে মানুষটি ক্লাসে খুব বেশি কথা বলেন না, তাকেই দেখা যায় দলের জন্য সবচেয়ে জোরে চিৎকার করতে।
নিজের বিভাগকে প্রতিনিধিত্ব করার অনুভূতিটাও এখানে আলাদা। একটি জার্সি তখন শুধু জার্সি থাকে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় একটি পরিচয়। মাঠে নামা খেলোয়াড় জানেন, তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সহপাঠীদের প্রত্যাশা। তার একটি গোলের সঙ্গে আনন্দ করবে অনেকগুলো মুখ। তার একটি ভুলে মন খারাপ হবে আরও অনেকের। এই কারণেই একটি সাধারণ ম্যাচও কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ হয়ে ওঠে। জয় তখন শুধু স্কোরবোর্ডের হিসাব নয়। জয় হয়ে ওঠে একসঙ্গে আনন্দ করার কারণ।
আবার হারও শুধু পরাজয় নয়। খেলা শেষে মাঠের এক পাশে বসে থাকা কয়েকটি মুখে তখন হয়তো মন খারাপের ছাপ। কেউ চুপ করে থাকে, কেউ ম্যাচের ভুলগুলো নিয়ে কথা বলে। কেউ আবার বলে, পরের ম্যাচে ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে দল। খেলাধুলার সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হয়তো এখানেই। একটি ম্যাচ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু চেষ্টা শেষ হয় না। হারের পরও নতুন করে মাঠে নামার ইচ্ছা তৈরি হয়। পরাজয় তাই অনেক সময় পরের জয়ের গল্পের শুরু হয়ে থাকে।
এই প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য শুধু জয় আর পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি আসার একটি সুযোগও তৈরি হয় এর মধ্য দিয়ে। যারা প্রতিদিন একই ক্যাম্পাসে চলাফেরা করেও একে অপরকে খুব বেশি চিনতেন না, একটি ম্যাচ তাদের পরিচিত করে দিতে পারে। মাঠে তারা প্রতিপক্ষ। খেলা শেষে হয়তো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। কোনো ভালো খেলোয়াড়ের প্রশংসা করছেন অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীও। কোনো উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সবাই মিলে সেই ম্যাচের গল্প করছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েই তৈরি হচ্ছে এক ধরনের বন্ধুত্ব।
মাঠ মানুষকে দলবদ্ধ হতে শেখায়। এখানে কেউ একা জিততে পারে না। একজন খেলোয়াড় যত ভালোই হোন, তার পাশে সতীর্থ না থাকলে দল এগিয়ে যেতে পারে না। কখন কোথায় পাস দিতে হবে, কখন নিজের জায়গা ছেড়ে অন্যকে জায়গা করে দিতে হবে, কখন ভুল করা সতীর্থকে আবার উৎসাহ দিতে হবে, এসব শেখা যায় মাঠে। বইয়ের পাতায় যার কোনো অধ্যায় নেই, জীবনের জন্য সেই শিক্ষাগুলো অনেক মূল্যবান। তাই খেলাধুলা শুধু শরীরকে সচল রাখে না। মানুষকে একসঙ্গে চলার অভ্যাসও তৈরি করে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে তাই প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে অনেক ছোট ছোট গল্প। কোনো গল্পে আছে শেষ মুহূর্তের গোল। কোনো গল্পে আছে দুর্দান্ত এক সেভ। কোনো গল্পে আছে হেরে যাওয়ার পর সতীর্থকে জড়িয়ে ধরা। আবার কোনো গল্পের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়তো খেলা শেষ হওয়ার পরে। মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা, একে অপরকে নিয়ে মজা করা, খেলার ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা করা কিংবা বাড়ি ফেরার পথে সারাদিনের ম্যাচ নিয়ে কথা বলা। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বড় স্মৃতিগুলো অনেক সময় এমন ছোট মুহূর্ত থেকেই তৈরি হয়।
সময় একদিন সবাইকে এই মাঠ থেকে দূরে নিয়ে যাবে। ক্লাস শেষ হবে, সেমিস্টার শেষ হবে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনটিও চলে আসবে। তখন হয়তো মনে থাকবে না কোন পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছিলাম, কোন অ্যাসাইনমেন্টের জন্য কত রাত জেগেছিলাম। কিন্তু মনে থাকবে কোনো এক বিকেলে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন বন্ধুর মুখ। মনে থাকবে প্রিয় দলের জন্য চিৎকার করা। মনে থাকবে একটি গোলের পর হঠাৎ চারপাশের সবাইকে আপন মনে হওয়ার সেই মুহূর্ত। কারণ কিছু স্মৃতি তারিখ দিয়ে মনে থাকে না। তারা থেকে যায় অনুভূতি হয়ে।
হয়তো এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের আলাদা একটি ভাষা আছে। সেই ভাষায় কথা বলে বলের শব্দ, জুতোর নিচে ঘাসের শব্দ, দূর থেকে ভেসে আসা হাততালি আর বন্ধুদের চিৎকার। সেই ভাষায় লেখা থাকে জয়ের গল্প, পরাজয়ের গল্প, বন্ধুত্বের গল্প। আর সবচেয়ে বেশি লেখা থাকে তারুণ্যের গল্প।
অক্টোবরের আকাশের নিচে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ এখন সেই গল্পই লিখছে। প্রকৃতি তার রং বদলাচ্ছে, আর মাঠ বদলে দিচ্ছে ক্যাম্পাসের ছন্দ। ক্লাসরুমের ব্যস্ততা পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা ফিরে আসছে খোলা আকাশের নিচে। কেউ খেলোয়াড় হয়ে, কেউ দর্শক হয়ে, কেউ বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই এই গল্পের অংশ।
একদিন খেলা শেষ হবে। মাঠ আবার ফাঁকা হয়ে যাবে। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ঘাসের ওপর থেকে সরে যাবে। খেলোয়াড়রা ফিরে যাবে নিজেদের ঘরে। গ্যালারির মতো জমে থাকা ভিড়ও একসময় মিলিয়ে যাবে। তবু মাঠের বুকের কোথাও থেকে যাবে তাদের ছুটে চলার স্মৃতি। থেকে যাবে একটি বিকেলের উচ্ছ্বাস, একটি দলের স্বপ্ন, একটি বিভাগের ভালোবাসা।
পরের দিন আবার হয়তো কেউ এই মাঠে আসবে। বল হাতে নেবে। জার্সি পরবে। দূর থেকে বন্ধুরা ডাক দেবে। আবার বাঁশি বাজবে। আবার দৌড় শুরু হবে।
আর তখন মনে হবে, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ কখনো সত্যিই ফাঁকা থাকে না। সে অপেক্ষা করে থাকে তারুণ্যের জন্য। অপেক্ষা করে থাকে সেই বিকেলের জন্য, যখন কয়েক জোড়া তরুণ পা বলের পেছনে ছুটবে আর তাদের সঙ্গে ছুটবে একটি পুরো ক্যাম্পাসের স্বপ্ন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

