ছবি: সংগৃহীত
মাইক্রোফোনের সামনে আশা ভোঁসলের জীবনটা ছিল আলোঝলমলে। তবে আড়ালের জীবনটা গাঢ় অন্ধকারে ভরা; জীবনজুড়ে দুঃসহ যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেছেন তিনি।
আশা ভোঁসলের মৃত্যুর পর ঘুরেফিরে তা সামনে আসছে। ‘আশা ভোঁসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’ বইয়ে অকপটে সব বলে গেছেন এই সংগীতশিল্পী। বইটি লিখেছেন রমা শর্মা।
জীবনীতে আশার কোনো রাখঢাক ছিল না। যন্ত্রণাদায়ক দাম্পত্য থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা— সবই বলে গেছেন আশা।
অল্প বয়সে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন আশা। স্বামীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ২০ বছর। কিন্তু এই সম্পর্ক কোনো রূপকথার মতো ছিল না। বইটিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শোনা যায়, গণপতরাও মদ্যপ ছিলেন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন— এমনকি গর্ভাবস্থায়ও, যার ফলে তাকে প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো।’
নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আশা বলেন, পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল, তারা গায়িকা পুত্রবধূকে মেনে নিতে পারেনি।
স্বামী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর মেজাজ খারাপ ছিল। হয়তো তিনি কষ্ট দিতে পছন্দ করতেন, হয়তো তিনি স্যাডিস্ট ছিলেন। কিন্তু বাইরে কেউ তা জানতে পারত না। আমি তাকে সম্মান দিতাম, কখনো তার কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি।’
জীবনীতে আশা ভোঁসলে জানান, তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আশা বলেন, ‘একবার মনে হয়েছিল, আমার নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া উচিত। আমি অসুস্থ ছিলাম। চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাসপাতালে ছিলাম, যেখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল।’
নিজের মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে আশা বলেন, ‘মনে হয়েছিল যেন নরকে এসে পড়েছি। মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু গর্ভের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এতটাই প্রবল ছিল যে আমি মারা যাইনি। আমাকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়।’
পরে গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে আশার দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে। বিচ্ছেদের পর রাহুল দেব বর্মনকে বিয়ে করেন আশা।
রবিবার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারতীয় সংগীত জগতের উজ্জ্বল এ নক্ষত্র মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে শনিবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন এই শিল্পী। শনিবার রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। রবিবার দুপুরে তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে এই বরেণ্য শিল্পীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। সোমবার তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় গায়িকা আশা ১৯৩৩ সালে সংগীত অনুরাগী মঙ্গেশকর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র নয় বছর বয়স থেকেই পেশাদার গান গাওয়া শুরু করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে চলচ্চিত্রে প্রথম গান রেকর্ড করার পর ১৯৫০-এর দশকেই বলিউডে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেন। বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের ছায়ায় ঢাকা না পড়ে নিজস্ব গায়কী ঢঙে তিনি কয়েক দশক ধরে শ্রোতাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন।
শুরুতে চটুল বা ক্যাবারে ধাঁচের গানের জন্য তাকে ‘টাইপকাস্ট’ করা হলেও, পরবর্তীতে ‘উমরাও জান’-এর গজল গেয়ে তিনি নিজের বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি সাতবার ফিল্মফেয়ার সেরা নেপথ্য গায়িকার পুরস্কার এবং দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ‘উমরাও জান’ ছবির ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ এবং ‘ইজাজত’ ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ গানের জন্য তিনি জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করেন।
আট দশকের বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি একাধিক ভারতীয় ভাষার পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি ভাষায়ও হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, পপ থেকে গজল বিভিন্ন ধারার সংগীতে অসাধারণ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে বোন লতার ব্যক্তিগত সচিব ৩১ বছর বয়সী গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন তিনি। তবে শ্বশুরবাড়ির দুর্ব্যবহারের কারণে তিন সন্তানসহ ১৯৬০ সালে সেই সম্পর্ক ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে বিখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণের (আর ডি বর্মণ) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বর্মণ পরিবারের প্রবল আপত্তি থাকলেও তাদের দীর্ঘদিনের প্রেম পরিণয়ে রূপ পায়। ১৯৯৪ সালে আর ডি বর্মণের মৃত্যু পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ছিলেন। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তার নাতনি জেনাই ভোঁসলে ছিলেন তার ছায়াসঙ্গী।
তার প্রয়াণে ভারতীয় সংগীত জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই তার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করছেন। আশার মৃত্যুতে ভারতের সংগীত ভূবনে একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

