প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের উত্তাপে এখন তপ্ত গোটা রাজ্য। রাজনীতির এই লড়াইয়ের আঁচ স্টুডিও পাড়া থেকে টলিপাড়ার অলিগলি— সর্বত্র। এবারের নির্বাচনে টলিউডের একঝাঁক তারকা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির ময়দানে নাম লিখিয়েছেন। কেউ ঘাসফুল শিবিরে, কেউ বা পদ্ম শিবিরে।
কিন্তু এই সবের মাঝে টলিউডের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে পরিচিত প্রসেনজিৎ
চট্টোপাধ্যায়ের নাম যখন রাজনৈতিক সমীকরণে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা আর সাধারণ গসিপের পর্যায়ে
থাকে না। অবশেষে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন এই মহাতারকা। স্পষ্ট
ভাষায় জানিয়ে দিলেন, অভিনয়ের বাইরে অন্য কোনো পরিচয়ে তিনি পরিচিত হতে চান না।
ঘটনার সূত্রপাত গত ফেব্রুয়ারি মাসে। প্রসেনজিৎ
চট্টোপাধ্যায় ভারত সরকারের সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ খেতাব পাওয়ার পর তার বালিগঞ্জের
বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। সেই সময় প্রসেনজিতের
সঙ্গে তার কুশল বিনিময়ের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে ফিসফাস শুরু হয়। অনেকেই
ধারণা করেছিলেন, বড় কোনো চমক অপেক্ষা করছে এবং হয়তো নির্বাচনের আগে বা পরে বিজেপির
ব্যাটন হাতে তুলে নিতে পারেন বুম্বাদা। যদিও সেই সময় অভিনেতা একে কেবলই ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী উত্তেজনার মাঝে
বিতর্ক নতুন করে উস্কে দেন বিজেপি নেতা তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। শিবপুর বিধানসভা
কেন্দ্রের এই বিজেপি প্রার্থী সোমবার দাবি করেন যে, তার সঙ্গে টলিপাড়ার একঝাঁক তারকার
কথা হয়েছে। রুদ্রনীলের দাবি অনুযায়ী, সৃজিত মুখোপাধ্যায় কিংবা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের
মতো প্রথিতযশা পরিচালকদের পাশাপাশি তাকে শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানিয়েছেন খোদ প্রসেনজিৎ
চট্টোপাধ্যায়। রুদ্রনীলের এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়।
প্রশ্ন ওঠে— তবে কি শেষমেশ গেরুয়া শিবিরে যোগ দিলেন প্রসেনজিৎ? তৃণমূল ঘনিষ্ঠ হিসেবে
পরিচিত টলিপাড়ার একাংশও এই খবরে বেশ অবাক হয়ে পড়ে।
গুঞ্জন যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল,
ঠিক তখনই মঙ্গলবার (৫ মে) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করে পাল্টা
জবাব দেন অভিনেতা। প্রসেনজিৎ লেখেন, “আমি দীর্ঘ বহু বছর ধরে অত্যন্ত সম্মানের
সঙ্গে অভিনয় করে আসছি এবং আগামীদিনেও ঠিক একইভাবে কাজ করে যেতে চাই। আপনাদের সকলের
কাছে আমার একটাই বিনীত অনুরোধ, দয়া করে আমার গায়ে কোনো রাজনৈতিক রং লাগাবেন না।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক
দলের মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা প্রচার করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। তিনি কেবলই একজন
শিল্পী হিসেবে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে চান।
রুদ্রনীল ঘোষের করা দাবি নিয়েও প্রসেনজিৎ
তার বক্তব্য স্পষ্ট করেছেন। ইন্ডাস্ট্রির এই ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ জানান, তিনি নিজে কাউকে
ফোন করেননি, বরং ওপাশ থেকেই ফোন এসেছিল। রুদ্রনীলের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত
সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রুদ্রনীল আমার ছোট ভাইয়ের মতো। ও আমায়
ফোন করেছিল। একজন বড় দাদা হিসেবে ছোট ভাইকে আশীর্বাদ করা আমার কর্তব্য, আর আমি কেবল
সেটুকুই পালন করেছি। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগসূত্র নেই।”
প্রসেনজিতের এই মন্তব্যে পরিষ্কার যে,
ব্যক্তিগত সৌজন্য আর রাজনৈতিক আনুগত্য— এই দুইয়ের মধ্যে তিনি একটি সুষ্পষ্ট সীমারেখা
টেনে দিতে চান।
এবারের নির্বাচনে টলিউডের মেরুকরণ চোখে
পড়ার মতো। একদিকে রাজ চক্রবর্তী, সায়নী ঘোষ, জুন মালিয়াদের মতো তারকারা যেমন তৃণমূলের
হয়ে লড়াই করেছেন, অন্যদিকে রুদ্রনীল ঘোষ, পায়েল সরকার, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়রা লড়েছেন
বিজেপির প্রতীকে। এই অবস্থায় প্রসেনজিতের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের নিরপেক্ষ থাকাটা
বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
বরাবরই নিজেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে পছন্দ করেন। বিগত বাম আমল থেকে শুরু করে তৃণমূলের
শাসনকাল— সব সময়ই তিনি প্রশাসনিক প্রধানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেও দলীয় ঝাণ্ডা
থেকে দূরে থেকেছেন। তার সাম্প্রতিক এই বিবৃতি সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। প্রসেনজিতের
এই বলিষ্ঠ অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তার অগণিত ভক্ত।
নেটিজেনদের মতে, একজন শিল্পীর রাজনৈতিক
মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু পেশাদারিত্বের জায়গায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই বড় পরিচয়।
প্রসেনজিৎ তার বিবৃতিতে সেই আস্থারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
আপাতত জল্পনার ধোঁয়া কাটলেও, নির্বাচনের
এই মৌসুমে তারকাদের প্রতিটি পদক্ষেপই যে আতসকাঁচের নিচে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের এই কড়া জবাব প্রমাণ করে দিল যে, স্টুডিও পাড়ার ‘ইন্ডাস্ট্রি’ কেবল পর্দাতেই নয়, বাস্তব
জীবনেও নিজের ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তা রক্ষায় সমান সচেতন।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

