মৃণাল সেন আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন: চঞ্চল চৌধুরী
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ২১:১৯
চঞ্চল চৌধুরী
উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম মহীরুহ মৃণাল সেন। তাঁর জীবনদর্শন ও নির্মাণের নেপথ্য গল্প এবার সেলুলয়েডের পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে সৃজিত মুখার্জির ‘পদাতিক’ ছবিতে। কিংবদন্তি এই নির্মাতার নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী।
মৃণাল সেনের জন্মবার্ষিকী ঘিরে সম্প্রতি
ভারতীয় গণমাধ্যম ‘আনন্দবাজার অনলাইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চঞ্চল জানিয়েছেন তাঁর এই
অনন্য যাত্রার অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং বর্তমান সময়ের সিনেমা ও রাজনীতির সমীকরণ
নিয়ে।
চঞ্চল চৌধুরীর শৈশব কেটেছে পাবনার কামারহাটে,
যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছাতেও সময় লেগেছিল। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকে গ্রামে
প্রথম যখন ভিসিআর আসে, তখনই মৃণাল সেনের কাজের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। তিনি বলেন,
“উপমহাদেশের সিনেমা
বলতে আমরা সত্যজিৎ, মৃণাল ও ঋত্বিক—এই ত্রয়ীর নামই সবার আগে নিই। তবে মৃণাল সেনের নির্মাণশৈলী
ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র, যা আমাকে ছোটবেলা থেকেই মুগ্ধ করেছে।”
সৃজিত মুখার্জির কাছ থেকে যখন ‘পদাতিক’-এ অভিনয়ের প্রস্তাব পান, তখন চঞ্চল
বেশ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, মৃণাল সেনের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে পর্দায়
ধারণ করা তাঁর জন্য অসম্ভব। চঞ্চল বলেন, “সৃজিতদাকে প্রথমে মানাও করেছিলাম। কিন্তু
তাঁর আমার ওপর অগাধ ভরসা ছিল। শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি কেবল শ্রদ্ধা থেকে।”
চরিত্রটির জন্য কেবল প্রস্থেটিক মেকআপ
নয়, মৃণাল সেনের চালচলন ও মানসিকতা আয়ত্ত করতে চঞ্চলকে দীর্ঘ সময় গবেষণা করতে হয়েছে।
তিনি জানান, বই পড়ার চেয়ে মৃণাল সেনের সিনেমাগুলো বারবার দেখে তাঁকে চেনার চেষ্টা করেছেন
বেশি। তাঁর মতে, মৃণাল সেনের ‘প্রচারবিমুখতা’ এবং ‘আপসহীন মানসিকতা’ তাঁকে ব্যক্তি চঞ্চল
হিসেবেও নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। সাক্ষাৎকারে রাজনীতি ও চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিয়ে
চঞ্চল চৌধুরী বেশ সোজাসাপ্টা মত দেন।
তাঁর মতে, মৃণাল সেনের সিনেমা মানেই ছিল
সমাজবাস্তবতা ও শোষিত মানুষের কথা। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেভাবে তিনি সোচ্চার
হতেন, আজকের দিনে তা বিরল।
চঞ্চল বলেন, “আগে সিনেমা ছিল সমাজকে প্রশ্ন করার প্রধান
মাধ্যম। কিন্তু এখন অনেক নির্মাতা রাজনৈতিক বিষয় এড়িয়ে নিরাপদ পথে হাঁটেন। এখনকার সময়ে
স্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে গেলে নানা জটিলতা তৈরি হয়, যা শিল্পীদের ওপর মানসিক চাপ
সৃষ্টি করে। সিনেমার সেই প্রতিবাদের জায়গাটি এখন অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে।” মৃণাল
সেনের জীবনের আর্থিক সংকট, ব্যর্থতা এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত
সংগ্রামের মিল খুঁজে পান চঞ্চল।
তিনি মনে করেন, ‘পদাতিক’ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি মানসিকভাবে
আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। সাক্ষাৎকারের শেষে এই অভিনেতা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “যদি কোনোদিন সরাসরি মৃণাল সেনের সঙ্গে
দেখা হতো, তবে প্রথমেই তাঁকে প্রণাম জানাতাম। তাঁর জীবনদর্শন কেবল পর্দার জন্য নয়,
আমার ব্যক্তিজীবনেরও পাথেয় হয়ে থাকবে।”
সৃজিত মুখার্জির ‘পদাতিক’ কেবল একটি জীবনীচিত্র নয়, বরং
চঞ্চল চৌধুরীর মাধ্যমে মৃণাল সেনের সেই ‘পদাতিক’ সত্তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয়
করিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা। আর এই চরিত্রের মাধ্যমে চঞ্চল নিজেও একজন অভিনেতা হিসেবে
নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

