ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং কালজয়ী মহাকাব্যিক সিনেমা ‘লগান: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ইন্ডিয়া’ আবারও ফিরছে প্রেক্ষাগৃহে। মুক্তির প্রায় ২৫ বছর পর বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তকে নস্টালজিয়ার সাগরে ভাসিয়ে জনপ্রিয় এই ছবিটি নতুনভাবে বড় পর্দায় প্রদর্শনের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে প্রযোজনা সংস্থা ‘আমির খান প্রোডাকশনস’।
জানা গেছে, আগামী ১২ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত
ভারতের নির্বাচিত কিছু প্রেক্ষাগৃহে বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে পুনরায় মুক্তি পেতে চলেছে
২০০১ সালের এই মাস্টারপিস। এই পুনর্মুক্তিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে
ছবিটির একটি নতুন ও আধুনিক ট্রেলার, যা মুক্তির সাথে সাথেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
ঝড় তুলেছে।
নতুন ট্রেলারটি যেন এক জাদুকরী সেতু, যা দর্শককে মুহূর্তের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময় আগের সেই অবিস্মরণীয় সিনেমাটিক অভিজ্ঞতার কাছে। ১৮৯৩ সালের ব্রিটিশ শাসিত ভারতের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবির মূল গল্পের আবেগ ও সারাংশ নতুন ট্রেলারে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সিনেমার গল্পে দেখা যায়, মধ্য ভারতের এক গ্রামের মানুষ যখন ভয়াবহ খরা আর ব্রিটিশদের অতিরিক্ত করের (লগান) চাপে পিষ্ট, তখন অহংকারী ব্রিটিশ সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন রাসেল গ্রামবাসীদের সামনে এক অদ্ভুত শর্ত ছুঁড়ে দেন।
শর্তটি হলো— ব্রিটিশদের সাথে ক্রিকেট ম্যাচে জিততে
পারলে আগামী তিন বছরের জন্য পুরো কর মওকুফ করা হবে, আর হেরে গেলে দিতে হবে তিনগুণ লগান!
যে খেলা সম্পর্কে গ্রামবাসীদের কোনো ধারণাই ছিল না, ভুবনের (আমির খান) নেতৃত্বে সেই
অচেনা খেলাই হয়ে ওঠে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ঐক্য, দেশপ্রেম, বিশ্বাস আর অসম্ভবকে
জয় করার এই জেদই ‘লগান’-কে সময়ের সীমানা পেরিয়ে চিরন্তন করে তুলেছে।
ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন প্রখ্যাত নির্মাতা
আশুতোষ গোয়ারিকর। কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমির খানের দুর্দান্ত অভিনয় ছাড়াও ছবিটিতে গুরুত্বপূর্ণ
চরিত্রে ছিলেন গ্রেসি সিং, ব্রিটিশ অভিনেত্রী র্যাচেল শেলি, রঘুবীর যাদব, যশপাল শর্মা
এবং প্রদীপ রাওয়াতসহ একঝাঁক গুণী শিল্পী। ‘লগান’-এর অন্যতম মূল শক্তি ছিল এর কালজয়ী
মিউজিক। অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক এ আর রহমানের সুরে তৈরি করা ‘ঘনন ঘনন’, ‘মিতওয়া’ কিংবা ‘রাধে ক্যাসে না জলে’-র মতো গানগুলো আজও
শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে দোলা দেয়। নতুন ট্রেলারে ব্যবহৃত রহমানের সেই চেনা আবহসংগীত
পুরনো স্মৃতিকে আরও একবার উসকে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘লগান’ ভারতীয় চলচ্চিত্রকে এক অনন্য উচ্চতায়
নিয়ে গিয়েছিল। একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি এটি ২০০২
সালে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের (অস্কার) ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগে চূড়ান্ত
পাঁচ-এ মনোনয়ন পেয়েছিল। ‘মাদার ইন্ডিয়া’ এবং ‘সালাম বম্বে’-র পর এটিই ছিল অস্কারে মনোনীত
হওয়া তৃতীয় ভারতীয় সিনেমা। এমনকি ২০২৫ সাল পেরিয়ে ২০২৬ সালেও অস্কারের এই বিভাগে চূড়ান্ত
মনোনয়ন পাওয়া শেষ ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে ‘লগান’ তার ঐতিহাসিক অবস্থান ধরে রেখেছে।
এছাড়া ভারতের ৪৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে
সেরা পপুলার ফিল্ম, সেরা মিউজিকসহ একাই আটটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় সম্মাননা লুফে নিয়েছিল
এই ছবি। পুরনো প্রজন্মের আবেগ এবং নতুন প্রজন্মের তুমুল কৌতূহল—সব মিলিয়ে ২৫ বছর পর
বড় পর্দায় ‘লগান’-এর এই পুনর্মুক্তি
বিনোদন দুনিয়ায় এখন আলোচনার শীর্ষবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

