বিশ্বখ্যাত হলিউড পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’ -র শুটিং লোকেশন নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মরক্কোর অবৈধ দখলে থাকা পশ্চিম সাহারার আদিবাসী সাহরাউই জনগণের অধিকার ও দুর্ভোগকে উপেক্ষা করে সেখানে শুটিং করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাতারা।
সাহরাউই বহুমাত্রিক শিল্পী ও চলচ্চিত্র
নির্মাতা মোহাম্মদ স্লেইমান লাবাত এক নিবন্ধে নোলানের এই পদক্ষেপকে গল্প বলার শিল্পের
প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা এবং দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত
করেছেন।
গ্রীক কবি হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত
‘দ্য ওডিসি’ সিনেমাটির
মূল উপজীব্য হলো—ভিটেমাটি চ্যুত হওয়া, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং নিজ ভূমিতে ফেরার
দীর্ঘ সংগ্রাম। সাহরাউইদের দাবি, এই সিনেমার গল্পের মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাদের বাস্তব
জীবনের গত ৫০ বছরের নির্মম ও করুণ ইতিহাসের হুবহু মিল রয়েছে। অথচ নোলান ও তার প্রযোজনা
দল কোনো নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে বা স্থানীয় জনগণের সম্মতি না নিয়েই পশ্চিম সাহারার
‘দাখলা’ অঞ্চলে
সিনেমার দৃশ্যধারণ করেছেন। এর মাধ্যমে তারা মূলত মরক্কো সরকারের একটি সাজানো জনসংযোগ
বা পিআর ক্যাম্পেইনের অংশ হয়েছেন, যা এই অবৈধ দখলদারিত্বকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈধতা
দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, পশ্চিম সাহারা
একটি স্বশাসিত নয় এমন অঞ্চল। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, আদিবাসী জনগণের স্পষ্ট সম্মতি
ছাড়া এই অঞ্চলের কোনো প্রাকৃতিক বা সাংস্কৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র দলগুলো এখানে এসে সেখানকার বালিয়াড়ি,
সংস্কৃতি ও পোশাকের সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দী করে অস্কার বা বক্স অফিসের সাফল্যের জন্য
পাড়ি জমাচ্ছে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন কিংবা প্যারিসে। অন্যদিকে, নিজ ভূমিতে সাহরাউইরা দিনে
দিনে সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে এবং তাদের পদ্ধতিগতভাবে নীরব ও প্রান্তিক করে রাখা হচ্ছে।
পশ্চিম সাহারার এই বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত নির্মম ও স্বৈরাচারী।
১৯৭৫ সালে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা
অঞ্চলটি মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার হাতে হস্তান্তর করার পর থেকেই সেখানে সামরিক আগ্রাসন
শুরু হয়। বর্তমানে সাহরাউই জনগণের অর্ধেক অংশ আলজেরিয়ার মরুভূমির শরণার্থী শিবিরে
মানবেতর জীবনযাপন করছে। আর বাকি অর্ধেক বাস করছে মরক্কোর কঠোর সামরিক পুলিশি নজরদারিতে,
যা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে ২,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক সামরিক প্রাচীর এবং লক্ষ লক্ষ ল্যান্ডমাইন
দ্বারা।
সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য হলো—যে
মাটিতে বিদেশি নির্মাতাদের রাজকীয়ভাবে স্বাগত জানানো হচ্ছে, সেই মাটিতে একজন সাহরাউই
সাংবাদিক বা নির্মাতার হাতে ক্যামেরা থাকাটাই একটি বড় অপরাধ। মরক্কো সরকারের আরোপিত
বয়ানের বাইরে গিয়ে সাহরাউইদের প্রকৃত দুর্দশার ছবি তোলার চেষ্টা করলেই তাদের ভাগ্যে
জুটছে অন্ধকার কারাগার।
সিনেমাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মরক্কো
প্রশাসন অঞ্চলটির একটি রোমান্টিক ও পর্যটন-বান্ধব ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছে, যাতে
বিশ্ববাসীর চোখ থেকে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আড়াল করা যায়। সাহরাউই শিল্পীদের
দাবি, বিশ্বব্যাপী দর্শকদের জানা উচিত যে ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমার যে মনোরম দৃশ্য তারা
পর্দায় দেখছেন, তা আসলে একটি নির্যাতিত জাতির কান্নার ওপর ভিত্তি করে ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

