Logo

বিনোদন

মৃত্যুর ১৫ বছর পর আজও প্রাসঙ্গিক তারেক মাসুদ

Icon

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২১:১২

মৃত্যুর ১৫ বছর পর আজও প্রাসঙ্গিক তারেক মাসুদ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নিজস্ব ভাষা, প্রগতিশীল চিন্তা ও সাবলীল দৃশ্যকাব্যের প্রবর্তক তারেক মাসুদ। ১৩ আগস্ট এই মহান রূপকারের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালের এই দিনে মানিকগঞ্জের ঘিওরে কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রের শুটিং লোকেশন নির্বাচন শেষে ঢাকা ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন তার দীর্ঘদিনের কাজের সঙ্গী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন।

সময় গড়ালেও বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার যে ব্যবচ্ছেদ তারেক মাসুদ তার চলচ্চিত্রে করে গেছেন, মৃত্যুর ১৫ বছর পরও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষণীয়।

১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তারেক মাসুদ। তার শিক্ষাজীবনের বড় একটা সময় কেটেছে মাদরাসায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার ধারায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ইতিহাসের ছাত্র হওয়ার সুবাদেই হয়তো জাতীয় আত্মপরিচয়, সমাজ-রাজনীতির শিকড় ও মুক্তিযুদ্ধকে দেখার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর। আশির দশকে যখন মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা ফ্যান্টাসিনির্ভর হয়ে উঠছিল, তখন তিনি স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের অগ্রদূত হয়ে বিকল্প ধারার সিনেমার পথ দেখান।

চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবন, শিল্প ও দর্শন নিয়ে আদম সুরত’ নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় সাত বছর সুলতানের সান্নিধ্যে কাটান তারেক মাসুদ। ১৯৮৯ সালে এটি মুক্তির পর থেকেই নির্মাতাদৃষ্টি আরও পরিপক্ব রূপ পায়।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে মার্কিন চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনের ১৯৭১ সালে ধারণ করা দুর্লভ ভিডিও ফুটেজ খুঁজে পান তিনি। স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে সেই ফুটেজের ওপর ভিত্তি করে ১৯৯৫ সালে উপহার দেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির গান’।

জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড’-এর পর এটিই মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় প্রজেক্টরে ছবি প্রদর্শনী এবং এর প্রতিক্রিয়া থেকে পরবর্তীতে নির্মিত হয় মুক্তির কথা’।

২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া তারেক মাসুদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র মাটির ময়না’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক দরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। নিজের আত্মজৈবনিক মাদরাসা জীবনের আলোকেই মুক্তিযুদ্ধপূর্ব বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, অন্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি ও লোকজ বিশ্বাসের চিরন্তন টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলেছিলেন এতে।

ছবিটি ২০০২ সালে ঐতিহ্যবাহী কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট বিভাগে প্রদর্শিত হয় এবং মর্যাদাপূর্ণ ফিপ্রেস্কি’ পুরস্কার অর্জন করে। তিনিই প্রথম নির্মাতা, যার হাত ধরে আন্তর্জাতিক অস্কারের 'সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র' বিভাগে বাংলাদেশ প্রথম প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়।

তারেক মাসুদের প্রতিটি সৃষ্টিতেই ছিল দূরদর্শিতার ছাপ। প্রবাসীদের আত্মপরিচয়ের মনস্তাত্ত্বিক সংকট নিয়ে নির্মিত অন্তর্যাত্রা’ আজও আধুনিক অভিবাসী জীবনের বাস্তব আয়না। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নরসুন্দর’-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারি নরসুন্দরদের মানবিক আশ্রয় দেখিয়ে সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানবিকতার বার্তা দিয়েছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে নির্মিত রানওয়ে’ চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের উদীয়মান সামাজিক সংকট ও তরুণদের চরমপন্থায় ধাবিত হওয়ার কারণ তুলে ধরেন, যা সমসাময়িক সময়ের জন্য এক সতর্কবার্তা ছিল। সবমিলিয়ে প্রামাণ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য মিলিয়ে ১৬টি চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন তিনি।

 ১-২ বছরের পরিকল্পনায় কাজ না করে বহু বছর ধরে সিনেমা নিয়ে গবেষণা করা এবং মাটির ও মানুষের গল্পকে বিশ্বমানের ভাষায় পরিবেশন করার যে তাগিদ তাঁর ছিল, তা আজকের তরুণ নির্মাতাদের কাছে দিকনির্দেশক।

মৃত্যুর সময় তিনি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করছিলেন কাগজের ফুল’। দুর্ভাগ্যজনক সড়ক দুর্ঘটনাটি তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেয়নি।

শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও, ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য, মুক্তচিন্তার খোরাক জোগাতে কিংবা সিনেমাকে শিল্পের মর্যাদায় টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই—মৃত্যুর দেড় দশক পরও তারেক মাসুদ আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক।

 

বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন