মানুষ যদি আগে থেকেই জানতে পারত তার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়গুলো কেমন হবে— কবে অতি আপনজনকে হারিয়ে ফেলবে, কবে কোথায় হারবে, কবে অসুস্থ হবে, কবে প্রতারিত হবে কিংবা কবে মহাবিপদে পড়বে— তবে সে হয়তো এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে পারত না। দুশ্চিন্তার ভারে তার ঘুম উধাও হয়ে যেত। বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্ত বিষণ্ন আশঙ্কায় ঢেকে যেত। ভবিষ্যৎ অজানা বলেই মানুষ আজ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে এবং সাহস সঞ্চয় করে সামনে এগিয়ে যায়।
মানুষ স্বভাবতই কৌতূহলী। সে জানতে চায় আগামীকাল কী হবে, আগামী বছর কোথায় থাকবে কিংবা জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে সে কি সন্তুষ্ট হতে পারবে? এই অদম্য কৌতূহলই মানুষকে জ্যোতিষীর কাছে নিয়ে যায়, ভবিষ্যদ্বাণীর বই খুলতে বাধ্য করে কিংবা নানা হিসাব-নিকাশে জীবনকে আগাম নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করায়। কিন্তু এই জানতে চাওয়ার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা— ‘অনিশ্চয়তার ভয়’।
ভাবুন তো, কেউ যদি আজ নিশ্চিতভাবে জানত যে পাঁচ বছর পর তার মা মারা যাবেন কিংবা দশ বছর পর তার সব অর্জন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, তবে সে কি আজকের হাসিটুকু উপভোগ করতে পারত? যদি জানা থাকত কোনো এক নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট বিপর্যয় তার জন্য অপেক্ষা করছে, তবে কি সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারত? উত্তর হলো— না। ভবিষ্যৎ জানার এমন ভার বহন করার মতো মানসিক প্রস্তুতি মানুষের থাকে না।
আসলে ভবিষ্যৎ না জানাই মানুষের জন্য এক বড় আশীর্বাদ। অজানাই মানুষকে আশাবাদী করে তোলে। অজানার কারণেই মানুষ বিশ্বাস করে, হয়তো আগামীকাল ভালো কিছু ঘটবে। এই ‘হয়তো’ শব্দের ওপর ভর করেই মানুষ লড়াই চালিয়ে যায়, ব্যর্থতার পর আবার ঘুরে দাঁড়ায়, ভেঙে পড়েও নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস পায়।
মানুষ যদি আগে থেকেই পরিশ্রমের ফলাফল নিশ্চিতভাবে জানত, তবে অনেক ক্ষেত্রেই সে চেষ্টাই করত না। ব্যর্থতা নিশ্চিত হলে মানুষ আগেভাগেই হাল ছেড়ে দিত; আবার সাফল্য নিশ্চিত হলে অনেকেই আলস্যে ডুবে যেত। অনিশ্চয়তাই মানুষকে সচল রাখে, সৃজনশীল করে এবং জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে। অন্যদিকে, মানুষ যদি তার ভবিষ্যৎ জানত, তবে নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করে আরও অহংকারী ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠার শঙ্কা থাকত।
আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ মানুষের ভবিষ্যৎ আন্দাজ করার ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে এখন বলা সম্ভব হচ্ছে—কে কোন রোগে আক্রান্ত হতে পারে, কোন ব্যবসায় কত লাভ হবে কিংবা কোন পেশা হারিয়ে যাবে। কিন্তু এই পূর্বাভাসও শেষ পর্যন্ত কেবলই অনুমান; কারণ মানুষের জীবন কেবল পরিসংখ্যান নয়। এখানে আবেগ আছে, আকস্মিকতা আছে আর আছে জীবনের নানা অলৌকিক মোড়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় বড় পরিবর্তন এসেছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে। কেউ জানত না একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস গোটা পৃথিবীকে থামিয়ে দেবে। কেউ ভাবেনি প্রযুক্তির এক ক্লিকে সম্পর্ক গড়বে, আবার ভাঙবেও। ভবিষ্যৎ যদি মানুষ আগেভাগে জানত, তবে ইতিহাসের গতিপথই বদলে যেত— হয়তো তা কল্যাণের জন্য নয়, বরং ভয়াবহতার দিকেই যেত।
বর্তমানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— ভবিষ্যৎ নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা না করে বর্তমানকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যাপন করা। মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না বলেই তাকে সততা, পরিশ্রম ও মানবিকতার পথ বেছে নিতে হয়; কারণ সে বিশ্বাস করে আজকের কাজই আগামীকালের ভিত্তি তৈরি করে।
ভবিষ্যৎ না জানাই মানুষের জন্য স্রষ্টার বড় রহমত। অজানার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য, ধৈর্য ও সার্থকতা লুকিয়ে আছে। মানুষ ভবিষ্যৎ জানলে হয়তো বেঁচে থাকত ঠিকই, কিন্তু জীবনের স্বাদ, সাহস আর আশা হারিয়ে ফেলত মৃত্যুর বহু আগেই। সেটি হতো এক ভয়াবহ জীবন।
লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
এমএইচএস

