মৃত্যুর এই সংখ্যা ৫০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ
হাম ও উপসর্গে রেকর্ড ১৭ শিশুর মৃত্যু
রায়হান উল্লাহ
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ২৩:১৪
ফাইল ছবি
হাম ও হামের উপসর্গে দেশে শিশুমৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গত ৫০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ নিয়ে দেড় মাসের কিছু বেশি সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১১-এ, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ৫২ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৫৯ শিশু। একই সময়ে হাজারের বেশি নতুন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হওয়া এবং শত শত শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়া, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব, পরিকল্পনাহীন নীতিগত পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্য খাতে সমন্বয়হীনতার কারণেই এই প্রাদুর্ভাব তীব্র আকার নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) অপর্যাপ্ত টিকাকভারেজ ও দীর্ঘদিন সম্পূরক ক্যাম্পেইন না থাকার বিষয়টিকে সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন, জরুরি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম আবার মহামারি রূপে ফিরে এসে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
১৭ শিশুর মধ্যে ১৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। অপর দুই শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সোমবার (৪ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। এই হিসাব রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের। অবশ্য এই ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ১৫ শিশুর মধ্যে দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে আগের দিন।
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে যে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ১২টি শিশুই ঢাকা বিভাগের আর পাঁচটি শিশু চট্টগ্রাম বিভাগের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ দেখা গেছে এক হাজার ৩০২টি শিশুর মধ্যে। তাদের মধ্যে ৬১৮টি শিশুই ঢাকা বিভাগের। এরপর আছে চট্টগ্রাম (১৯২), রাজশাহী (১৬৮) ও বরিশাল (১৩৩) বিভাগ। দেশের আট বিভাগে এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৬ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে আট বিভাগে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৬১ জন গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতায় হামের প্রাদুর্ভাব: শিশুদের নিয়ম মতো টিকা দেওয়ায় একসময় হামের সংক্রমণ বিরল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু চলতি বছর এই রোগের সংক্রমণ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোর জন্য একসময় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি সদ্য সাবেক এই সরকারের ১৮ মাসের আমলে কার্যত ভেঙে পড়ে।
টিকা কেনার পদ্ধতি ও অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। যা থেকে দেখা দেয় টিকার সংকট। শেষ পর্যন্ত টিকার মজুত একেবারে তলানিতে নেমে আসে। এর ধারাবাহিকতায় শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব। এর সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন এবং কয়েক দফায় কর্মবিরতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা টিকাদান কর্মসূচির আওতা কমে যাওয়ার বিষয়ে বারবার সতর্ক করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পুরো মেয়াদে কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেনি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে একটি বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি চালানোর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হাম ও রুবেলা (এমআর-১ ও এমআর-২) টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর থেকে দেশব্যাপী সম্পূরক ক্যাম্পেইন না হওয়াকে এ সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
সংকটের শুরু: ১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) বাস্তবায়ন করে আসছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ‘অপারেশন প্ল্যান’ (ওপি) নামে পরিচিত এই কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, টিকাদান ও পরিবার পরিকল্পনাসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
এইচপিএনএসপির চতুর্থ ধাপ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য এক লাখ ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম ধাপের প্রস্তাব দিয়েছিল।
নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির ৬০টি বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, এটাই হবে এই কর্মসূচির শেষ ধাপ। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে একটি ‘এক্সিট প্ল্যান’ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু তার বদলে ২০২৫ সালের মার্চে পুরো এইচপিএনএসপি বাতিল করে দেয় মন্ত্রণালয়। সিদ্ধান্ত হয়, টিকাদানসহ সব ‘ওপি’র অধীন থাকা সেবাকে সরাসরি সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সমন্বয় বাড়ানো ও অবকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে চতুর্থ ধাপের অসমাপ্ত কাজ শেষ করা এবং ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রাখতে কয়েকটি ‘ব্রিজিং প্রকল্প’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে এসব প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অনুমোদনই মেলেনি। পরে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতেও কেটে যায় আরও কয়েক মাস। ফলে ক্রয়প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় নানা সেবা স্থবির হয়ে পড়ে।
শুধু টিকাই নয়, ওপি বাতিলের প্রভাবে দেশের ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ কমে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো মানুষ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়ার জন্য চালু ৪৫০টি এনসিডি কর্নারেও সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়।
তহবিল সংকটে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। কারণ, জ্বালানি ও চালকদের বেতন ওই কর্মসূচির অর্থ থেকেই দেওয়া হতো।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগনিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বহু পরীক্ষিত এই কর্মসূচি খামখেয়ালিভাবে বন্ধ করা উচিত হয়নি। তিনি বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সরকার চাইলে সেগুলো সমাধান করতে পারত। কিন্তু পুরো কর্মসূচি হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এক্সিট প্ল্যান কোথায় ছিল? সেটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে পরিস্থিতি হয়তো এতটা খারাপ হতো না।’
এমআর নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও এপিডেমিওলজিস্ট অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, অপারেশন প্ল্যান স্থগিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইন ডিরেক্টর ও প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের কার্যক্রমও থেমে যায়। এতে জনবলের বড় শূন্যতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সদর দপ্তরে মাত্র তিনজন কর্মকর্তা ছিলেন। এটাই ছিল সমস্যার বড় কারণগুলোর একটি।
তিনি আরও জানান, অপারেশন প্ল্যান না থাকায় এই প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায়। রাজস্ব বাজেটের অর্থ ব্যবহার করে নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ার সময় নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুরো খাতটি অপারেশন প্ল্যাননির্ভর থাকায় নতুন ব্যবস্থায় যেতে আন্তবিভাগীয় ব্যাপক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু তাতে যে এত সময় লাগবে, তা অন্তর্বর্তী সরকার আগে বুঝতে পারেনি।
তিনি বলেন, কর্মকর্তারা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত না হওয়া এবং নতুন উদ্যোগ নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই মূলত বিলম্ব হয়েছে।
টিকা সংগ্রহে বিলম্ব: অপারেশন প্ল্যান বাতিল এবং ব্রিজিং প্রকল্প অনুমোদনে অনেক সময় লেগে যায়। অবশেষে ২০২৫ সালের আগস্টে ৮৪২ কোটি টাকা টিকা কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এর আগে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) টিকা কিনত বাংলাদেশ। কিন্তু সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, অর্ধেক টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে এবং বাকি অর্ধেক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হবে। এ ছাড়া ইউনিসেফের সঙ্গে টিকার মূল্য নিয়ে দর-কষাকষি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
৩০ এপ্রিল প্রকাশিত সায়েন্স ডটঅর্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিসেফ এ পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্স ডটঅর্গকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই হতাশাজনক ছিল।’ প্রতিবেদন মতে, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে সে সময় বলেছিলেন, ‘দোহাই লাগে, এটা করবেন না!’
অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘বাস্তবতা হলো- টিকা সংগ্রহে বিলম্বের কারণে টিকাদানের আওতা ঠিকভাবে বজায় রাখা যায়নি, যার ফলেই এই প্রাদুর্ভাব। দায় যদি কাউকে নিতে হয়, তাহলে তা অন্তর্বর্তী সরকারের। তারা যথাযথ টিকাদান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি বা সমষ্টিগত সুরক্ষা তৈরি হয়নি।’
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, দীর্ঘদিনের টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি ছিল। বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতেই প্রতিযোগিতামূলক দামে টিকা কেনার চেষ্টা হয়।
ইউনিসেফের সতর্কবার্তা তিনি পেয়েছিলেন ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর, যখন পুরো প্রক্রিয়াই প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। ফলে তখন আর তা পর্যালোচনার পর্যাপ্ত সময় ছিল না।
হয়নি বিশেষ ক্যাম্পেইন: ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ‘অপর্যাপ্ত হার্ড ইমিউনিটি’র মধ্যে এই প্রাদুর্ভাব ঘটছে। অর্থাৎ পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকা পায়নি।
বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রথম ডোজের কভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। পরে ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজের আওতাও বাড়ে। এ সময় আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
২০২৩ সালে এমআর-১ টিকার মোট কভারেজ (ঠিক সময়ে ও বেঠিক সময়ে উভয় হিসাব মিলিয়ে) ছিল ১০০ দশমিক এক শতাংশ। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশে। একই সময়ে এমআর-২ কভারেজ ৯৮ দশমিক এক শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশে।
তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত হার আরও কম। কারণ, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট চলাকালে মাঠপর্যায়ে অনেক টিকাদান না হয়েও কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘টিকাদানের হার কমে যাওয়ার বিষয়ে একাধিকবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমাদের দেশে গ্রামের অনেক মানুষ আছে, যারা আইসোলেশন সম্পর্কে খুব ভালো জানেন না; একটু লক্ষণ দেখা দিলেই হাসপাতালে চলে আসছেন। তাই প্রতিটি হাসপাতালের মধ্যে হামের বিশেষায়িত ইউনিট করার নির্দেশনা দিয়েছি। এমনিতে দেশের যে ঘনবসতি, তাতে কোনো শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে আলাদা রাখতে হবে। এসব কথা ওয়ান টু ওয়ান বলা কঠিন। তবে সেবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টাই করছি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, হামের এই অবস্থায় দেশে স্বাস্থ্যের বিষয়ে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা প্রয়োজন, যাতে সবাই সবার মতো স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু সরকারের অনেকে মনে করেন, এটি করলে হয়তো কারো কারো ক্ষমতা কমে যাবে, তাই এটি না করে অলিখিত জরুরিভাবে সব কাজ করছে। মোটাদাগে আগুন লাগার পর নেভানোর কাজ যেভাবে হয়, সেভাবে হচ্ছে। তবে কোভিড পরবর্তী সময়েও আমরা মহামারিতে কীভাবে কাজ করতে হয়, সেটি শিখলাম না।
হামের এই পরিস্থিতি যেভাবে: চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রোগটি নিয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্যউপাত্ত সংরক্ষণ শুরু করে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুসারে, ২০০৫ সালে ২৫ হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছিল এবং ১০০ জনের বেশি শিশু মারা গিয়েছিল। এরপর আর এত বেশি শিশু আক্রান্ত বা মৃত্যু কোনো বছরই হয়নি।
ইপিআই কর্মকর্তা, জনস্বাস্থ্যবিদ ও চিকিৎসকরা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো পান না করানো ও অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এ প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
বিশেষ কমিটির সুপারিশ ‘উপেক্ষা’: হাম-রুবেলা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যে বিশেষ কমিটি রয়েছে, সেই ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন (এনভিসি) সবশেষ গঠিত হয় ২০১৭ সালে। অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন নয় সদস্যের এ কমিটি প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল বৈঠক করে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই সভায় নেওয়া সুপারিশে বলা হয়, কোনো উপজেলায় রোগী শনাক্ত হলে সেখানে কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। বরং হামের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটি প্রাথমিকভাবে বাড়িতে এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে।
এরপর ১২ এপ্রিল এনভিসির সঙ্গে যৌথসভা করে টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ)। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, নাইট্যাগ চেয়ারপারসন ফিরদৌসী কাদরী।
সভায় নেওয়া দুই সুপারিশে বলা হয়, এনভিসির সুপারিশের সঙ্গে নাইট্যাগ একমত প্রকাশ করছে। অন্যটিতে বলা হয়, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ববিদ, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ, ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটির কাজ হবে রোগ শনাক্তের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্দেশনা দেওয়া।
এ সভার দুই সপ্তাহ পর গত ২৭ এপ্রিল বিশেষ কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে সদস্যদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন কমিটির একজন সদস্য।
এনভিসির চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হাম মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান শুরু হয়েছে। তবে টিকাদানের পাশাপাশি হাম মোকাবিলার জনস্বাস্থ্যবিধির বহুল প্রচার দরকার ছিল, সেটা হয়নি।
ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলায় সম্প্রতি একাধিক কর্মকর্তাকে ওএসডি হয়েছে। টিকা, স্বাস্থ্যসহ সব বিষয়ে কথা বলার বিষয়ে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
শিশু হাসপাতালের পরিচালক মাহবুবুল বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করেই শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছি। শিশুদের ইমিউনিটি বাড়ানোর জন্য ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টসহ অন্যান্য কিছুই দিচ্ছি।
একাধিক টিকার মজুদ শেষ: ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, দুই কোটি ১৯ লাখ ডোজ হামের টিকা (এমআর) দিয়ে এবারের চলমান টিকাদান কর্মসূচি ‘ভালো ভাবেই’ শেষ হবে। কারণ এক কোটি ৮০ লাখের কিছু বেশি সংখ্যক শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল রোববার বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রার ৮১ শতাংশ শিশু হামের টিকার আওতায় এসেছে। এখন এক্ষেত্রে কোনো ‘ঘাটতি’ বা ‘দুর্বলতা’ নেই।
তবে এর মধ্যে বেশ কিছু টিকার মজুদ ফুরিয়ে গেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) গত ১৬ এপ্রিলের তথ্য অনুসারে, পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি বা ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন, পিসিভি বা নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন, এমআর বা মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা ভ্যাকসিন (পাঁচ ডোজ), বিসিজি বা ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুয়েরিন টিকা ও টিডি বা টিটেনাস অ্যান্ড ডিপথেরিয়া- এই ছয় ধরনের টিকার মধ্যে প্রথম চারটির মজুদ শূন্য। শেষ দুটিরও মজুদ একেবারেই তলানিতে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ছয় ধরনের টিকাসহ অন্তত ১০ ধরনের টিকার বড় চালান শিগগিরই আসছে। মঙ্গলবার একটি কার্গো ফ্লাইটে এসব টিকা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

