Logo

স্বাস্থ্য

‘জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলই বর্তমান হাম সংকট’

Icon

স্বাস্থ্য ডেস্ক :

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১৭:৪৩

‘জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলই বর্তমান হাম সংকট’

সংগৃহীত

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।

শনিবার (১৬ মে) ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট আয়োজিত ‘হামে শিশুমৃত্যু : জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরা হয়। রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৫৫ হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ জন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হলেও এবার ৯ মাসের আগেই অনেক শিশু সংক্রমিত হয়েছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকে এবং চার দিন পর পর্যন্ত অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সময়মতো পূর্ণমাত্রায় টিকা নিলে হাম প্রতিরোধ সম্ভব হলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি টিকা সংগ্রহ, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, হামের জটিলতা প্রতিরোধে ভিটামিন-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগে সরকারি কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রতি ছয় মাস অন্তর ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সারাদেশে গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার, সরকারি হাসপাতালে বিশেষ হাম কর্নার চালু, নিয়মিত ভিটামিন-এ কর্মসূচি পুনরায় চালু, প্রান্তিক শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, টিকা উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যখাতে শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগের দাবি জানান বক্তারা। পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।

তারা আরও বলেন, জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দিতে হবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জানান তারা। বক্তাদের মতে, COVID-19 মহামারি থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরও দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বর্তমান হাম পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম বলেন, দেশে বয়স্ক ও নবজাতকদের জন্য আইসিইউ থাকলেও পর্যাপ্ত পিআইসিইউ নেই। এবার ৯ মাসের আগেই শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি আরও বলেন, মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে আগের মতো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় ব্রেস্টফিডিংয়ের হার কমে গেছে। পাশাপাশি কোভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য ও মাতৃ পুষ্টিহীনতা বাড়ায় তার প্রভাব শিশুদের ওপরও পড়ছে। শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে আইসোলেশন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “হামে এখনো যেভাবে শিশুমৃত্যু হচ্ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। টিকাদানে গাফিলতি, জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং কিছু ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই আমরা এ সংকটে পড়েছি। জনস্বাস্থ্যকে অবহেলার ফলই বর্তমান হাম সংকট।”

বাংলাদেশেরখবর/আরকে

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন