ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশা, কেমোর বিকল্প স্মার্ট ওষুধ
স্বাস্থ্য ডেস্ক :
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১৮:৫২
সংগৃহীত
ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে অত্যাধুনিক ‘স্মার্ট ওষুধ’। গবেষকদের দাবি, কেমোথেরাপির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রোগীর নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসের পথ তৈরি করছে নতুন এই প্রযুক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যান্সারবিষয়ক সম্মেলন American Society of Clinical Oncology (ASCO)-তে (এএসসিও) এ সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে।
প্রায় ৪০ হাজার বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে নতুন ওষুধ, উন্নত থেরাপি এবং জীবনধারাভিত্তিক চিকিৎসা নিয়ে ২ হাজার ৭০০-এর বেশি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল— ক্যান্সার চিকিৎসার অগ্রগতি ও তার বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী রোগীদের চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করা।
ক্যান্সার কোষের ‘অদৃশ্য ঢাল’ ভাঙতে নতুন ওষুধ
গবেষকদের অন্যতম আলোচিত আবিষ্কার হলো পরীক্ষামূলক ওষুধ ‘জিআরডব্লিউডি৫৭৬৯’। এই ট্যাবলেট ক্যান্সার কোষের নিজেকে লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, ফলে রোগীর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজেই টিউমার শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত পরীক্ষায় ৮৩ জন রোগীর মধ্যে ২৬ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর মধ্যে ১৫ জনের ক্ষেত্রে টিউমারের আকার ৩০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই ওষুধ ক্যান্সার কোষের ‘ইনভিজিবিলিটি ক্লোক’ বা অদৃশ্য থাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেয়।
প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারে বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ
বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যান্সারগুলোর একটি Pancreatic Cancer-এর চিকিৎসায়ও আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।
‘দারাক্সনরাসিব’ নামের একটি নতুন ওষুধের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি গ্রহণকারী রোগীরা গড়ে ১৩ দশমিক ২ মাস বেঁচে ছিলেন। অন্যদিকে প্রচলিত কেমোথেরাপি গ্রহণকারীদের গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬ থেকে ৬ দশমিক ৭ মাস।
গবেষকেরা এই ফলাফলকে ক্যান্সার চিকিৎসায় ‘গেমচেঞ্জিং’ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব
সম্মেলনে উপস্থাপিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ছাড়াই নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
University College London-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপটিমা ট্রায়াল’-এ চার হাজার স্তন ক্যান্সার রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে কম ঝুঁকির রোগীদের শনাক্ত করে শুধুমাত্র হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়।
ফলাফলে দেখা গেছে, এসব রোগী কেমোথেরাপি ছাড়াই সফলভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন।
এছাড়া ব্লাডার ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন একটি ইমিউনোথেরাপি ওষুধ ব্যবহার করে অনেক রোগীর অস্ত্রোপচার এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
বাড়ছে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা
উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি সম্মেলনে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতাও তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবনধারাগত পরিবর্তনের কারণে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬৫ জন। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ২০০ জনে পৌঁছাতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা সাড়ে ৩ কোটির বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যকর জীবনধারার গুরুত্ব
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনিদ্রা ও দীর্ঘদিনের খারাপ ঘুমের অভ্যাস স্তন, ডিম্বাশয়, অন্ত্র ও জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে অনিদ্রায় আক্রান্ত তরুণদের মধ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তিন গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।
এছাড়া নিয়মিত যোগব্যায়াম ক্যান্সার রোগীদের উদ্বেগ, ক্লান্তি এবং অনিদ্রা কমাতে সহায়ক বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন আশার বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারার সমন্বয়ের ওপর। শিকাগোতে অনুষ্ঠিত এবারের এএসসিও সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাগুলো ক্যান্সার চিকিৎসাকে আরও কার্যকর, লক্ষ্যভিত্তিক এবং রোগীবান্ধব করে তোলার নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।
যদিও এসব ওষুধের অনেকগুলো এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও গবেষকদের আশা— আগামী বছরগুলোতে ক্যান্সার চিকিৎসায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
বাংলাদেশেরখবর/আরকে

