ইরানে বিক্ষোভে নিহত ১৯২, ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের হুমকি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৪৬
ইরানে বিক্ষোভ দমনপীড়নে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে, শোক আর ক্ষোভে ভারী হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জীবন। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন পুরো দেশের জন্য এক গভীর মানবিক সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে।
নিহত ও দমনপীড়নের চিত্র
ইরানের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে অন্তত ১৯২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নরওয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস। রোববার সংস্থাটি জানায়, ৬০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হয়, ফলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার যে কায়দায় বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি আর ঘোলাটে হচ্ছে এবং ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘোটতে পারে বলে সঙ্কা করা হচ্ছে। এই আশঙ্কা শুধু পরিসংখ্যান নয় বরং পরিবারের প্রিয়জন হারানোর কান্না আর হাসপাতালের করিডরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আহতদের আর্তনাদে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আন্দোলনের সূত্রপাত ও বিস্তার
জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে সেই বিক্ষোভ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর অন্যতম বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়, যা বিপাকে ফেলে দেয় ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনকে।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই বিক্ষোভ এখন আর শুধু দাম কমানো বা অর্থনৈতিক সংকটের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই, মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও বঞ্চনার কথাও উঠে এসেছে শ্লোগান আর প্ল্যাকার্ডের ভাষায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা না থাকার কষ্ট আজ ইরানের সাধারণ মানুষের মুখে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ফুটে উঠছে।
রাস্তায় আগুন, পাওয়া পাওয়া যাচ্ছে না স্বজনের খোঁজ
ইন্টারনেট বন্ধ করে খবরের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা চললেও রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৌঁছে গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, শনিবার রাতে তেহরান ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদসহ আর কয়েকটি শহরে ফের মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। কিছু গাড়িতে তখন আগুন জ্বলছিল, রাস্তায় ব্যারিকেড তুলে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন বিক্ষভকারিরা।
অন্যদিকে যাচাই করা না গেলেও কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের একটি মর্গে স্বজনদের ভিড়, নিখোঁজ প্রিয়জনের লাশ শনাক্ত করার ব্যাকুল চেষ্টা করছেন তারা।
ব্যাপক হত্যাকাণ্ড এবং হাসপাতালের করুণ বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান জানিয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও বিভিন্ন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইরানজুড়ে শত শত বিক্ষোভকারীর নিহত হওয়ার তথ্য তাদের হাতে এসেছে। সংস্থাটি পরিস্থিতিকে স্পষ্ট ভাষায় ‘ব্যাপক হত্যাকাণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছে, আরও প্রাণহানি ঠেকাতে এখনই বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।
সংস্থাটি আর জানায়, ইরানের বিভিন্ন হাসপাতাল আহত মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে, রক্তের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনেক বিক্ষোভকারীর চোখ লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অচল তেহরান ও সাধারণ মানুষের সংগ্রাম
তেহরান থেকে এএফপির এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, বিক্ষোভের কারণে রাজধানী শহরটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে শহরে মাংসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে উঠছে।
কিছু দোকান খোলা থাকলেও অনেক দোকান দীর্ঘসময় ধরে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যে দোকানগুলো খোলা থাকে, সেগুলোও বিকেল চারটা বা পাঁচটার মধ্যে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। শহরের রাস্তায় বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকায় মানুষের চলাফেরা, বাজার করা, কাজকর্ম সবই আতঙ্কময় হয়ে উঠেছে।
গ্রেপ্তার, ‘দাঙ্গাবাজ’ তকমা আর সরকারের বার্তা
ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদ রেজা রাদান শনিবার রাতে জানান, বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে তাদের সঠিক সংখ্যা এবং পরিচয় কী তা প্রকাশ করা হয়নি। এতে পরিবারগুলো আরও উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে, কারণ অনেকেই জানেন না তাদের প্রিয়জন কারাগারে আছে না নিখোঁজের তালিকায়।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, জনগণের বিশ্বাস করা উচিত যে সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে রাস্তায় পড়ে থাকা রক্ত আর বাড়ি না ফেরা সন্তানদের লাশ এই দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
নির্বাসিত রাজপুত্রের আহ্বান
বিদেশে অবস্থানরত ইরানের সাবেক শাহ রাজবংশের স্বঘোষিত রাজপুত্র রেজা পাহলভি রোববার নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বার্তায় বলেছেন, রাস্তা ছেড়ে না যেতে। তিনি তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বলেছেন, তিনি খুব শিগগিরই তাদের পাশে দাঁড়াবেন।
এই বার্তা দেশজুড়ে আন্দোলনরত অনেক মানুষের মনে নতুন করে আশা জাগালেও, অনেকে এটিকে রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবেও দেখছেন। দেশের ভেতরে প্রতিদিন মানুষ যখন জীবন বাজি রেখে রাস্তায় দাঁড়াচ্ছে, তখন দেশের বাইরে থেকে আসা এ ধরনের বার্তা তাদের মানসিক শক্তি বাড়ালেও পরিস্থিতি কতটা বদলাবে, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও যুদ্ধের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা অব্যাহত রাখে, তবে সামরিক পদক্ষেপের কথাও বিবেচনা করা হতে পারে, যা এই অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা বাড়াচ্ছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আহ্বান জানিয়েছেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েল ইরানি জনগণের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করে যা একদিকে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরিতাকে আরও তীব্র করে।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
এ অবস্থায় ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালালে ইরানও পাল্টা জবাব দেবে।
তার ভাষ্যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক হামলার পথে হাঁটে, তবে ইরানের কাছে দখলকৃত ভূখণ্ডসহ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং নৌপরিবহন কেন্দ্রগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে। এমন বার্তার মধ্যে দিয়ে ভেতরের বিক্ষোভ দমনে ব্যস্ত ইরান এখন বাইরের দিক থেকেও এক অনিশ্চিত সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, আর মাঝখানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।
ডিআর/এমএন

