Logo

আন্তর্জাতিক

পাক-আফগান সীমান্তে ২৭৪ তালেবান ও ৫৫ পাক সেনা নিহতের দাবি

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:৪৪

পাক-আফগান সীমান্তে ২৭৪ তালেবান ও ৫৫ পাক সেনা নিহতের দাবি

ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যের যোদ্ধা অন্তত ২৭৪ তালেবান ও ৫৫ পাক সেনা নিহতের দাবি করেছে ইসলামাবাদ।

 ইসলামাবাদ বলছে, এসব অভিযানে শত শত আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানও পাল্টা হামলায় পাকিস্তানি বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, তালেবান কর্তৃপক্ষের বিষয়ে তাদের দেশের ‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে’ এবং এখন থেকে এটি হবে ‘খোলামেলা যুদ্ধ’। তিনি অভিযোগ করেন, এর আগে, আফগান বাহিনী যৌথ সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানে হামলা চালায়। সেই ‘আগ্রাসনের’ জবাব দিতেই পাকিস্তান বাধ্য হয়ে হামলা চালিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পরে জানায়, আফগানিস্তানে তাদের অভিযান প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনায় অব্যাহত রয়েছে।

উভয় পক্ষের হতাহতের দাবি

দুই দেশই একে অপরের ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর দাবি করেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বলেছে, ২২টি স্থানে চালানো হামলায় ২৭৪ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। তাদের দাবি, ৮৩টি তালেবান পোস্ট ধ্বংস করা হয়েছে এবং আরও ১৭টি দখলে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান জানায়, তাদের ১২ জন সৈন্য নিহত, ২৭ জন আহত এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, শুক্রবার মধ্যরাতের দিকে শেষ হওয়া তাদের অভিযানে ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে। নিহতদের কয়েকজনের মরদেহ আফগানিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। আরও কয়েকজনকে জীবিত আটক করার কথাও জানানো হয়েছে। আফগান পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের আটজন সৈন্য নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন।

উভয় পক্ষের এসব হতাহতের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ

আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী কাবুল, কান্দাহার, পাকতিয়া ও জালালাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে। এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, এসব হামলায় ‘নিরীহ নাগরিক, শিশু ও নারী’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জালালাবাদে এক কৃষকের বাড়িতে বোমা হামলায় তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। পাকতিকা প্রদেশে শিশুদের একটি ধর্মীয় বিদ্যালয়েও হামলার অভিযোগ তোলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদ বলেন, চলমান লড়াই বন্ধে তার সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ চায়। তিনি জানান, পাকিস্তানের নজরদারি বিমান এখনো আফগান আকাশসীমায় উড়ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে তারা বারবার অবস্থান নিয়েছেন এবং এখনো সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান চান।

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের চিত্রাল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম ও বাজাউর জেলায় আফগান তালেবান বাহিনীকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

এদিকে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও এক সরকারি মুখপাত্র দাবি করেছেন, তারা ড্রোন ব্যবহার করে পাকিস্তানের ভেতরে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সফল বিমান হামলা চালিয়েছে।

পাকিস্তানের তথ্য প্রতিমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার বলেন, ‘পাকিস্তান তালেবান যোদ্ধারা ড্রোন ব্যবহার করে পাকিস্তানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলার চেষ্টা করেছিল, তবে সেগুলো অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থায় ভূপাতিত করা হয়েছে এবং এতে কোনো প্রাণহানি হয়নি।’

সংঘাতের সূত্রপাত

পাকিস্তানের সাম্প্রতিক হামলার আগে আফগানিস্তান জানায়, বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) তারা যৌথ সীমান্তে পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনা ও অবস্থানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে আক্রমণাত্মক অভিযান চালায়। এতে কয়েক ডজন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হওয়ার পাশাপাশি ১৯টি সেনা পোস্ট ও দুটি ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি করা হয়। আফগান পক্ষ জানায়, বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া লড়াই প্রায় চার ঘণ্টা স্থায়ী হয়ে মধ্যরাতের দিকে শেষ হয়।

পাকিস্তান এর আগে রবিবারের হামলায় অন্তত ৭০ জন যোদ্ধা নিহতের দাবি করেছিল। তবে আফগানিস্তান সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলে, সেখানে বেসামরিক লোকজন নিহত হয়েছেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যেকোনো আগ্রাসনের জবাব যথাযথভাবে দেওয়া হবে।

দুই দেশের মধ্যে ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। গত অক্টোবরের সংঘাতে উভয় পক্ষে ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি তীব্র হয়। পরে এক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাত থেমে যায়।

ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, কাবুল পাকিস্তান তালেবানসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাতে দিচ্ছে। পাকিস্তান তালেবান আদর্শিকভাবে আফগান তালেবানের ঘনিষ্ঠ হলেও তারা আলাদা সংগঠন।

খাজা আসিফ বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পাকিস্তান সরাসরি ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তার অভিযোগ, তালেবান ভারতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত ৫০ বছরে পাকিস্তান প্রায় ৫০ লাখ আফগান নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে এবং এখনো লাখো আফগান সেখানে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে এখন ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে এবং এটি উন্মুক্ত যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।

আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘আফগানরা ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষা করবে এবং আগ্রাসনের জবাব সাহসিকতার সঙ্গে দেবে।’ তিনি আরও মন্তব্য করেন, সহিংসতা ও বোমা হামলার সমস্যার সমাধান পাকিস্তানকে নিজস্ব নীতির পরিবর্তনের মাধ্যমে করতে হবে এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বেছে নিতে হবে।

ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল, তাই নতুন সংঘাত অপ্রত্যাশিত নয়। তার মতে, পাকিস্তানের আরও আক্রমণাত্মক কৌশল এ পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ দিক। পাকিস্তানের ভেতরে সাম্প্রতিক বড় সন্ত্রাসী হামলাগুলোর প্রেক্ষাপটেও উত্তেজনা বেড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আঞ্চলিক মধ্যস্থতার চেষ্টা

রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও সৌদি আরব পরিস্থিতি শান্ত করতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে বলে কূটনৈতিক সূত্র ও সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান- উভয় দেশের প্রতিবেশী ইরানও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আফগানিস্তান রাষ্ট্রদূত জালমে খলিলজাদ বলেন, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং তা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তার প্রস্তাব, দুই দেশের মধ্যে এমন একটি কূটনৈতিক চুক্তি হওয়া উচিত, যাতে কেউই নিজেদের ভূখণ্ড অন্য দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে ব্যবহার করতে না দেয়। এই চুক্তির বাস্তবায়ন কোনো বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় পক্ষ, যেমন তুরস্ক, তদারকি করতে পারে বলেও তিনি মত দেন।

সব মিলিয়ে সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও পরিস্থিতি এখনো অস্থির রয়ে গেছে।

এএস/

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আফগানিস্তান তালেবান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর