Logo

আন্তর্জাতিক

দীর্ঘ যুদ্ধের পথে মধ্যপ্রাচ্য

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০

দীর্ঘ যুদ্ধের পথে মধ্যপ্রাচ্য
  • ইরানে নিহত বেড়ে ১৩৩২ ক্ষতিগ্রস্ত ৩৬৪৩ স্থাপনা
  • ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি ট্রাম্পের 
  • আরও হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
  • মধ্যপ্রাচ্যে দুইশ শিশু নিহত: ইউনিসেফ

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গণহত্যাকারী ইসরায়েল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের অসম যুদ্ধের সপ্তম দিনে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ইরানজুড়ে বিমান হামলা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এরই মধ্যে ইরানে নিহত বেড়ে ১ হাজার ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এদিকে, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের সময়সীমা নিয়ে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের শুরুতে খুব দ্রুত অভিযান শেষ করার কথা বললেও এখন তিনি জানিয়েছেন, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে এবং এতে যত সময় লাগুক তিনি পিছপা হবেন না। আর ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র (আইআরজিসি) আলি মোহাম্মদ নাঈনি বলেছেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এদিকে, ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করে ট্রাম্প বলছেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।

গতকাল শুক্রবার আল জাজিরাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। আর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গতকাল সকালে তেহরানের সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ‘নতুন পর্যায়’ বলে ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হারানোর পরও ইরানের এমন পাল্টা আক্রমণ যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে দেশটি। একই সঙ্গে গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে পেন্টাগন। এ যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে-এমনটি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইতোমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম পলিটিকো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড পেন্টাগনের কাছে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত সদর দপ্তরে মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছে। এই অতিরিক্ত কর্মকর্তারা অন্তত ১০০ দিন বা সম্ভাব্যভাবে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে সহায়তা করবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন শুরুতে যে সময়সীমা উল্লেখ করেছিল, তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং শিগগিরই নতুন প্রজন্মের কৌশলগত অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে জানিয়ে দেশটির অভিজাত সামরিক বাহিনী আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মাদ নায়েইনি জানান, আগ্রাসনের জবাব দিতে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ট্রæ প্রোমিজ ৪-এর অভিযানের অধীনে এখন পর্যন্ত যে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়েছে, তা ইরানের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতার কেবল একটি ছোট অংশ।

নায়েইনি আরও জানান, ইরানের নতুন উদ্যোগ ও নতুন অস্ত্র আসছে। এসব প্রযুক্তি এখনো বড় পরিসরে ব্যবহার করা হয়নি। শত্রুপক্ষকে আগামী প্রতিটি সামরিক অভিযানে কঠোর আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। তার পরের দিন ১ মার্চ সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, আগামী ৪ সপ্তাহের মধ্যে ইরানে সামরিক অভিযান শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তিনি এই বক্তব্য দেওয়ার পরের দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগেসেথ বলেন, যুদ্ধ ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সাময়িকী টাইম-কে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো নির্ধারিত সময়সীমা নেই। ইরানে আমি শুধু আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে চাই। ’

ইরানে নিহত বেড়ে ১,৩৩২, ক্ষতিগ্রস্ত ৩,৬৪৩ স্থাপনা: ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার সপ্তম দিনে গতকাল পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান রেড ক্রিসেন্ট। রেড ক্রিসেন্ট বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বাহিনীর হামলার পর বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং নিহতের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এছাড়াও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। হামলার ফলে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা কেন্দ্রসহ হাজারো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট।

সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট পীর হোসেন কলিভান্দ জানিয়েছেন, সা¤প্রতিক এই সামরিক অভিযানে মোট ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের আবাসিক ঘরবাড়ি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩,০৯০টি ব্যক্তিগত বাড়িঘর ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সংঘাতের মানবিক দিকটি আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

রেড ক্রিসেন্টের হিসাব অনুযায়ী, আবাসিক ভবনের পাশাপাশি ৫২৮টি বাণিজ্যিক ও সেবা কেন্দ্রও হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ১৪টি চিকিৎসা ও ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সংস্থাটির নিজস্ব ৯টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করুক। তিনি বলেছেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।’ নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ কথা বলেন। ইরানের আত্মসমর্পণের পর নতুন ‘গ্রহণযোগ্য’ ইরানি নেতাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠনে সাহায্য করবে।

ইরানের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম টর্পেডো: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আবারও সমুদ্রের নিচ থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে একটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডো হামলায় ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা ডুবে গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘এই হামলাকে নীরব মৃত্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে।’ অন্যদিকে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বিষয়টি পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবহৃত টর্পেডোটি তাৎক্ষণিক প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

ইরানে সেনা পাঠানো সময়ের অপচয়: ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই মুহূর্তে ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘সময়ের অপচয়’ হবে। তিনি জানান, এখনই এমন কোনো পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছেন না।

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা সময়ের অপচয়। তারা সব কিছু হারিয়েছে। তারা তাদের নৌবাহিনী হারিয়েছে। তারা যা হারাতে পারে তার প্রায় সবই হারিয়েছে।’

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সাম্প্রতিক মন্তব্যও উড়িয়ে দেন। আরাঘচি এনবিসিকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল আক্রমণের জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্প ওই বক্তব্যকে ‘অযথা মন্তব্য’ বলে উল্লেখ করেন।

আরও হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের: ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাইনি জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এ লক্ষ্যে নতুন কিছু অস্ত্র আগে থেকেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। এজন্য নতুন অস্ত্রও আমরা আলাদাভাবে তুলে রেখেছি। সেসব এখনও বড় মাত্রায় ব্যবহার করা হয়নি। নতুন অস্ত্রগুলো শত্রæদের গুরুতর এবং যন্ত্রণাদায়ক প্রত্যাঘাত করবে। বর্তমানে সেগুলো পাইপলাইনে আছে, যথাসময়ে ব্যবহার করা হবে।

প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৩৭০ কোটি ডলার: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটনের আনুমানিক খরচ হয়েছে ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৯০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। মূলত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণেই এই বিশাল ব্যয় হচ্ছে। নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর (সিএসআইএস) এক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। গতকাল শুক্রবার এই যুদ্ধ সপ্তম দিনে পড়েছে। আজও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর স্টিলথ বোমারু বিমান এবং উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গবেষক মার্ক কানসিয়ান এবং ক্রিস পার্ক জানিয়েছেন, প্রথম ১০০ ঘণ্টার প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার (প্রতিদিন গড়ে ৮৯ কোটি ১৪ লাখ ডলার) ব্যয়ের মধ্যে খুব সামান্য অংশই বাজেটে বরাদ্দ ছিল। বাকি ৩৫০ কোটি ডলারের খরচই ছিল বাজেট বরাদ্দের বাইরে।

মধ্যপ্রাচ্যে দুইশ শিশু নিহত: মধ্যপ্রাচ্যে শনিবার থেকে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত শ’ দুয়েক শিশুর প্রাণ ঝরেছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থাটি বলেছে, তাদের মধ্যে ইরানে মারা গেছে অন্তত ১৮১ জন, লেবাননে ৭ জন, ইসরায়েলে ৩ জন এবং কুয়েতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

“শিশুরা যুদ্ধ শুরু করে না, কিন্তু অগ্রহণযোগ্যভাবে তাদের বড় মূল্য চুকাতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যেই শিশুদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে,” বলছে ইউনিসেফ।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনেই দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে মেয়েদের একটি স্কুলে হামলা হয়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ১৭৫ জন স্কুলশিশু নিহত হয়।

কুর্দিদের ইরানে হামলার আহ্বান ট্রাম্পের: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বাড়ার সাথে সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকের ইরানি কুর্দি বাহিনীকে ইরানের ওপর হামলা চালাতে উৎসাহিত করেছেন। ইসরায়েলি এক সূত্র বলেছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আজেরি, কুর্দি, লুর এবং সুন্নি গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিনই ধরেই তেহরানের ওপর ক্ষুব্ধ। অনেক দিক থেকেই তারা প্রস্তুত। একবার কর্মকাঠামো স্পষ্ট হলেই তারা সংগঠিত হতে পারে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি যে, এতে যুদ্ধের খরচ অনেক কমবে।

ইরানি কর্মকর্তারা অবশ্য এই কৌশল উড়িয়ে দিয়েছেন। পশ্চিম ইরানের এক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েল আগেও এই গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের ইরানে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে। আমরা ইরাকের পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছি।

এদিকে, আজারবাইজান সতর্ক করেছে যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কারণে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। ইসরায়েল গতকাল জানিয়েছে, তারা তেহরানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘ব্যাপক স্তরের’ আক্রমণ শুরু করেছে, ঠিক একই সময়ে উপসাগরীয় শহরগুলোতেও ইরানের পক্ষ থেকে নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু হয়েছে।

ইরানে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালুর ঘোষণা: মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মুখে থাকা ইরান জানিয়েছে, তারা ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কার্যক্রম ফের চালু করবে। ঘোষণা অনুযায়ী, তেহরান প্রদেশের সব মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও নির্বাহী দপ্তরে রোববার থেকে ২০ শতাংশ কর্মী সরাসরি কর্মস্থলে থেকে কাজ করবেন।

ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রদেশের সব নারী কর্মী ভার্চুয়ালি কাজ করবেন। কিছু ব্যাংক খোলা থাকবে। সেবা প্রদানকারী সংস্থার অপারেশনাল ইউনিট, পৌরসভা, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং সামরিক, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না। তেহরান প্রদেশের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের সব কর্মকর্তাদের বাসা থেকে কাজের সুযোগ থাকবে না; তাদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে।

ইরানে বহু ‘বাঙ্কার বাস্টার’ হামলা: ইরানের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চার এবং নৌবাহিনীর ওপর হামলা আরও জোরদার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বি-২ স্টিলথ বোম্বার থেকে ইরানের অভ্যন্তরে লুকানো ব্যালিস্টিক মিসাইলের মজুত রাখা লক্ষ্যবস্তুগুলোতে কয়েক ডজন ২,০০০ পাউন্ডের ‘বাঙ্কার বাস্টার’ (পেনিট্রেটর) বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।

গত ৭২ ঘণ্টায় রাজধানী তেহরানসহ ইরানজুড়ে প্রায় ২০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বোম্বার বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং সামরিক স্থাপনা।

অ্যাডমিরাল কুপার জানান, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অভিযান তীব্রতর হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এর আগে ২৪টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার কথা বললেও, বর্তমানে সেই সংখ্যা ৩০ ছাড়িয়ে গেছে।

ইসরায়েলি ঘাঁটিতে হামলা ও হুঁশিয়ারি হিজবুল্লাহর: লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের হাইফা নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে তারা ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান, গোলান মালভূমি এবং লেবানন সীমান্ত সংলগ্ন বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বৃষ্টির মতো রকেট ও কামানের গোলাবর্ষণ করে।

বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বর্বরোচিত হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুক্রবার ভোরে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে একটি জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। উত্তর ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চলে লেবানন সীমান্ত থেকে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বসবাসকারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে তারা। হিজবুল্লাহর সামরিক মিডিয়া বিভাগ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাব দেয়া হবে। তাদের এই প্রতিরোধ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই যৌথ হামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৬৫ জন স্কুলছাত্রী রয়েছেন। এর জবাবে তেহরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশগুলো ব্রিটিশ ঘাঁটির দিকে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই হামলা এখন ছড়িয়ে পড়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ইরান মধ্যপ্রাচ্য

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর